নিউক্লিয়ার ফিউশন: শক্তির অফুরান উৎস


সূর্যের ভেতরে যে শক্তি তৈরি হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে নিউক্লিয়ার ফিউশন। সূর্যের অভ্যন্তরে প্রচন্ড চাপ এবং তাপে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হিলিয়াম পরমাণু গঠন করে।  সেই সংযোজন থেকে বিপুল শক্তি নির্গত হয়। সেই সৌরশক্তির উপর নির্ভর করেই পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণী এবং উদ্ভিদকুল বেঁচে আছে। 

বলাই বাহুল্য, নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়াটি যদি পৃথিবীতে কৃত্রিমভাবে নিরাপদে ঘটানো সম্ভব হয় তাহলে মানবসভ্যতা এক সীমাহীন এবং পরিষ্কার শক্তির উৎস পেয়ে যাবে। এই অফুরন্ত শক্তির সন্ধানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৃহত্তম বৈজ্ঞানিক প্রয়াসের নাম- ইন্টারন্যাশনাল থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্টাল রিয়্যাক্টর, সংক্ষেপে ITER; এটা দক্ষিণ ফ্রান্সের প্রোভেন্স অঞ্চলে বর্তমানে নির্মাণাধীন।

ITER কে একটি পরীক্ষামূলক ফিউশন রিয়্যাক্টর বলা হয়, অর্থাৎ এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়, বরং প্রযুক্তিগত ভাবে প্রমাণ করার জন্য যে বড় স্কেলে ফিউশন রিয়্যাক্টর বাস্তবে পরিচালনা করা সম্ভব। এখানে টোকামাক নামের একটি ডোনাট আকৃতির যন্ত্রে, ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম, হাইড্রোজেনের এই দু'টি আইসোটোপকে একত্রে টেনে এনে চৌম্বকক্ষেত্রের সাহায্যে ভেতরে আটকে রাখা হবে। তারপর সেখানে তাপমাত্রা বাড়ানো হবে সূর্যের কেন্দ্রে থাকা তাপমাত্রারও বহু গুণ বেশি, প্রায় ১৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই অবস্থায় হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াসগুলো কুলম্ব ব্যারিয়ার ভেদ করে ফিউশন রিঅ্যাকশন ঘটাবে এবং সেখান থেকে উঠে আসবে অফুরন্ত শক্তির জোয়ার।

কিন্তু ‌বাস্তবে এই কাজটি সফলভাবে করা অত্যন্ত কঠিন হবে। কারণ এমন উচ্চ তাপমাত্রার প্লাজমা কোনো ধাতব পাত্রে রাখা যায় না। তাই সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক দিয়ে প্লাজমাকে দেয়ালের সঙ্গে স্পর্শ না করেই শুন্যে ভাসিয়ে রাখা হবে। ITER-এ ব্যবহৃত চৌম্বকগুলো পৃথিবীর কোনো বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক স্থাপনায় ব্যবহৃত চুম্বকের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন এবং এগুলোকে কার্যকর রাখতে চৌম্বকগুলোকে মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে হিলিয়ামের সাহায্যে ঠান্ডা রাখতে হবে। একদিকে ভেতরে কোটি ডিগ্রির উত্তাপ, অন্যদিকে দেয়ালের পাশে প্রায় পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রা - এই দুই চরম অবস্থাকে একই যন্ত্রে ধরে রাখা প্রকৌশল বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর পরীক্ষা।

ITER প্রকল্পটি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সমন্বিত বৈজ্ঞানিক নির্মাণকাজ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান, চীন, ভারত ও কোরিয়া- এই সাতটি প্রধান সদস্য দেশ এই প্রকল্পে সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। রিয়্যাক্টরের বিভিন্ন অংশ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তৈরি হচ্ছে, তারপর ধাপে ধাপে ফ্রান্সে এনে মিলিমিটার পর্যায়ের নির্ভুলতায় জোড়া লাগানো হচ্ছে। কারণ যন্ত্রাংশের সামান্য  অ্যালাইনমেন্টের ত্রুটি প্লাজমার গতিবিধি নষ্ট করে পুরো পরীক্ষাকেই ব্যর্থ করতে পারে।

বর্তমানে ITER-এর কাজ প্রবেশ করেছে সংযোজনের শেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী দশকের শুরুতে প্রথম প্লাজমা জ্বালানো হবে। সফল হলে এটি প্রমাণ করবে যে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত ফিউশন রিঅ্যাকশন কৃত্রিমভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। এর পরবর্তী ধাপে বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পথ খুলে যাবে, যেখানে সমুদ্রের পানি থেকে সংগৃহীত ডিউটেরিয়াম দিয়ে টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

যদি ফিউশন প্রযুক্তি পূর্ণ সাফল্য পায়, তাহলে ফসিল ফুয়েল নির্ভরতা, কার্বন নিঃসরণ, জ্বালানি সংকট ও ভূরাজনৈতিক জ্বালানি যুদ্ধ - এ সবকিছুই আমূল বদলে যেতে পারে। ITER তাই শুধু একটি গবেষণা রিয়্যাক্টর নয়, এটি মানবসভ্যতার শক্তির ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্টের সম্ভাব্য সূচনা বিন্দু। এখন যেটা চলছে সেটা মূলত পরীক্ষার প্রস্তুতি, ভবিষ্যতের শক্তি অর্থনীতির ভিত্তি গঠনের আগাম পরিকল্পনা। 

মানব সভ্যতার ইতিহাসে কয়েকটি মুহূর্ত আছে যেগুলো পরবর্তীকালে যুগবদলের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যেমন: চাকা আবিষ্কার, বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পরমাণু যুগে প্রবেশ, মহাকাশে অভিযান- এই ধারাবাহিকতার পরবর্তী সম্ভাব্য অধ্যায়টি হবে ফিউশন রিঅ্যাকশনকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনা। ITER এখন সেই ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় লিখছে। এখন শুধু দেখার অপেক্ষা, এই প্রচেষ্টা পূর্ণতায় পৌঁছায় কিনা।

© তানভীর হোসেন 

তথ্যসূত্র: https://www.bgr.com/1997413/largest-project-history-of-humanity-iter-fusion-reactor-final-phase/

Comments