বিশাল এই মহাবিশ্বে এমন কিছু রহস্য আছে, যেগুলো শুধু আমাদের কৌতূহল বাড়ায় না, বরং বিজ্ঞানের পরিধিকেও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। তার মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় আর ভয়ঙ্কর জিনিসটি হলো ব্ল্যাকহোল। একে তো চোখে দেখা যায় না, তার ওপর এর ভেতরে কী আছে, সেটা জানারও কোন উপায় নেই। শুধু এটুকু বোঝা যায়, ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষ এতটাই প্রবল যে আলো পর্যন্ত এর ভেতর থেকে বের হতে পারে না। আর ব্ল্যাকহোলের ভেতরে একবার ঢুকলে বেরোনোর কোন উপায় নেই। একেবারে অগস্ত্য যাত্রা।
এখন প্রশ্ন হলো, এই ব্ল্যাকহোল গুলো ঠিক কতটা বড় হতে পারে? সাধারণভাবে বলা যায়, ব্ল্যাকহোলের জন্ম হয় যখন একটি বিশাল নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে যায় এবং সেটা সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে নিজের মধ্যেই চুপসে যায়। এর ফলে তৈরি হয়,
‘স্টেলার ম্যাস ব্ল্যাক হোল’। এদের ভর সাধারণত দুই থেকে দশটি সূর্যের সমান হতে পারে।
তবে এটাই শেষ কথা নয়। কারণ এর থেকেও অনেক বিশাল ব্ল্যাকহোল রয়েছে, যাদের বলা হয়, "সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল"। এরা থাকে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও এমন একটি ব্ল্যাকহোল রয়েছে। যার নাম স্যাজিটারিয়াস এ-স্টার। এর ভর সূর্যের প্রায় ৪০ লক্ষ গুণ বেশি!
কিন্তু ব্ল্যাকহোল এর চেয়েও অনেক গুণ বেশি বড় হতে পারে। কিছু ব্ল্যাকহোল এতই বিশাল যে সেগুলোর সামনে সূর্যকে মনে হবে যেন একফোঁটা ধুলিকণা। এমনই এক দানবাকৃতির ব্ল্যাকহোলের নাম হচ্ছে, TON 618, এটা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় ব্ল্যাকহোলগুলোর একটি। এর ভর প্রায় ৬০ বিলিয়ন সূর্যের সমান! ভাবা যায়? এদের বলা হয়, "আল্ট্রাম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল"। TON 618 এর ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্ত, অর্থাৎ ব্ল্যাকহোলের যে সীমানা থেকে আলো আর বের হতে পারে না- সেটার প্রস্থ প্রায় ১৩০০ অ্যাস্ট্রোনমিকাল ইউনিট। অর্থাৎ সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের প্রায় তেরশো গুণ বেশি।
এমন মহাদানবীয় ব্ল্যাকহোলগুলো তৈরি হলো কী ভাবে? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শুরুতে তারা হয়তো ছিল ছোট ছোট স্টেলার ম্যাস ব্ল্যাকহোল, এরপর একের পর এক আশেপাশের নক্ষত্র এবং মহাজাগতিক গ্যাস ও ধূলিকণা গিলে খেয়ে বিশাল বড় হয়েছে। এমনও হতে পারে, একাধিক ব্ল্যাকহোল একত্রে মিশে তৈরি করেছে এমন এক মহাদৈত্য, যার ভর ছুঁয়েছে শত কোটি সূর্যের সীমা।
তবে এই বৃদ্ধির একটা সীমা আছে। গবেষকরা বলছেন, কোনো ব্ল্যাকহোলের ভর সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন সূর্যের চেয়ে বেশি হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তার আশপাশের গ্যালাক্সির গঠন যত বড়ই হোক, এক সময় সেটা আর পর্যাপ্ত গ্যাস বা বস্তু জোগান দিতে পারবে না। ফলে ব্ল্যাকহোল এরচেয়ে আর বড় হবার সম্ভাবনা নেই।
মজার ব্যাপার হলো, ব্ল্যাকহোল যত বড় হয়, তার গড় ঘনত্ব ততটাই কমে যায়। সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে এই ঘনত্ব অনেক সময় আমাদের বায়ুমণ্ডলের চেয়েও কম হতে পারে। কারণ ব্ল্যাকহোলের ব্যাসার্ধ তার ভরের সঙ্গে সরল অনুপাতে বাড়ে, ফলে তার আয়তন বাড়ে ঘন অনুপাতে। সেই অনুযায়ী গড় ঘনত্ব কমে যায়, যদিও ভর বৃদ্ধি পায়।
ব্ল্যাকহোল নিয়ে আরও এক জটিল প্রশ্ন হলো, এদের কেন্দ্রে থাকা “সিঙ্গুলারিটি” আসলে কী? যেটা তত্ত্ব মতে এক ধরনের বিন্দু, যেখানে সময়, স্থান, পদার্থ—সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। কেউ কেউ বলেন, আসলে হয়তো সিঙ্গুলারিটির বদলে আছে এক ধরনের ‘ফাজবল’ (fuzzball), যেটা তৈরি হয়েছে শক্তির স্ট্রিং থেকে। ফাজবল হলো স্ট্রিং থিওরির এক বৈপ্লবিক ধারণা, যেখানে বলা হয় ব্ল্যাকহোলের ভেতরে কোনো একক বিন্দুতে সিঙ্গুলারিটি থাকে না, বরং অসংখ্য কাঁটার মতো জট পাকানো স্ট্রিং দিয়ে তৈরি এক ধরনের ফাঁপা ‘ঝাঁঝরা’ গঠন থাকে। এই গঠনের মধ্যেই ব্ল্যাকহোলের সমস্ত তথ্য থাকে, এটাই হচ্ছে ফাজবল ধারণার মূল কথা।
আসলে ব্ল্যাকহোলের অভ্যন্তরে কি ঘটছে, সেটা আমরা এখনো জানিনা।
ব্ল্যাকহোলের মত বিশাল আর রহস্যময় বস্তুকে বোঝার জন্য মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেন। রেডিও টেলিস্কোপ, এক্স-রে, ছবি, এমনকি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে দুটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ বোঝার চেষ্টাও চলছে। আজকের দিনে এমন অনেক ব্ল্যাকহোলের সন্ধান মিলেছে, যেগুলো একে অপরকে ঘিরে ঘুরছে, এরা হয়তো এক সময় মিলিত হবে এবং সৃষ্টি করবে আরও বিশাল ব্ল্যাক হোল।
সবচেয়ে দারুণ বিষয় হলো, এমন কিছু বিশাল ব্ল্যাকহোল আছে, যেগুলো এতটাই ধীরগতিতে ঘোরে যে তাদের স্পিন শনাক্ত করা কঠিন। আবার কিছু ব্ল্যাকহোল রয়েছে যারা প্রচন্ড গতিতে ঘুরছে আর আশেপাশে বিশাল জেট ছুঁড়ে দিচ্ছে, যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন, তারা কতটা সক্রিয় আর ভয়াবহ।
শেষ কথা হলো, ব্ল্যাকহোল শুধু একটা বিস্ময়কর বস্তু নয়। এ এক মহাজাগতিক যাত্রার প্রতীক, যার শুরুটা হয় একটি নক্ষত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, আর শেষ হয় এমন এক রহস্যে যা আজও আমাদের অজানা। কিন্তু বিজ্ঞানের আলো দিয়ে মানুষ সেই অজানা অন্ধকারকে দেখতে চায়, কারণ এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মহাবিশ্বকে বোঝার চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র: ইউনিভার্স ম্যাগাজিন।
Comments