হ্যালির ধুমকেতু


স্যার এডমন্ড হ্যালি (১৬৫৬–১৭৪২) ছিলেন একজন প্রথিতযশা ইংরেজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। সপ্তদশ শতাব্দীতে তিনিই প্রথম দূরবীন দিয়ে পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে নিবিড়ভাবে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এজন্য ১৬৭৬ সালে তাঁকে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে যেতে হয়েছিল। এই পর্যবেক্ষণের ফলে দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে অনেক নক্ষত্রের অবস্থানকে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই পর্যবেক্ষণের ফলাফল তিনি নক্ষত্রের ক্যাটালগ আকারে প্রকাশ করেছিলেন।

সূর্যের চারপাশে গ্রহগুলোর কক্ষপথের আকৃতি নিয়ে হ্যালি কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। এ ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য তিনি স্যার আইজ্যাক নিউটনের সাথে দেখা করলেন। নিউটন তাঁকে জানালেন, এই কক্ষপথের বিষয়টি তিনি অনেক আগেই সমাধান করে ফেলেছেন। নিউটন বললেন, গ্রহগুলোর কক্ষপথ হলো উপবৃত্তাকার, যেমনটা জোহানেস কেপলার তাঁর সূত্রে দেখিয়েছিলেন। নিউটন কেপলারের সূত্রগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন নিজের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র প্রয়োগ করে, এবং অংক কষে তা প্রমাণও করেছিলেন। হ্যালি তখন নিউটনের কাছে তাঁর অংকের হিসেব-নিকেশ দেখতে চাইলেন। বিজ্ঞানী নিউটন ছিলেন কিছুটা অগোছালো প্রকৃতির মানুষ। গবেষণার সময় তিনি প্রায়ই নাওয়া-খাওয়া ভুলে যেতেন, কাগজপত্র যত্ন করে রাখতেন না। তাই নিউটন চট করে হ্যালিকে তাঁর গবেষণার কাগজপত্র দেখাতে পারলেন না। কিন্তু কয়েক মাস পর তিনি হ্যালির কাছে তাঁর গবেষণার সব কাগজপত্র পাঠিয়েছিলেন। নিউটনের গবেষণার ফলাফল দেখে হ্যালি অত্যন্ত চমৎকৃত হলেন। নিউটনের গবেষণাকে তিনি বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন। পরবর্তীতে হ্যালির পৃষ্ঠপোষকতায় নিউটনের জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica (Mathematical Principles of Natural Philosophy), সংক্ষেপে যাকে বলা হয় প্রিন্সিপিয়া, প্রকাশিত হয়েছিল। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি একটি অমর গ্রন্থ। হ্যালি ও নিউটনের বন্ধুত্ব আমৃত্যু অটুট ছিল।

১৬৮২ সালে লন্ডনের আকাশে একটি ধূমকেতু দেখা গিয়েছিল। এই ধূমকেতুটির গতিপথ নিয়ে গবেষণা করে হ্যালি বুঝতে পারলেন, ধূমকেতুটি একটি দীর্ঘ উপবৃত্তাকার পথে চলছে। ধূমকেতুটির বৈশিষ্ট্য দেখে তিনি আরো বুঝতে পারলেন, এই একই ধূমকেতুটি ১৫৩১ এবং ১৬০৭ সালেও দেখা গিয়েছিল। তখন নিউটনের সূত্র প্রয়োগ করে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, এই ধূমকেতুটি ৭৬ বছর পর, অর্থাৎ ১৭৫৮ সালে আবারও ফিরে আসবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, হ্যালি ততদিন বেঁচে ছিলেন না। তাঁর মৃত্যুর ১৭ বছর পর, ১৭৫৮ সালের ডিসেম্বর মাসের বড়দিনে, হ্যালির ভবিষ্যদ্বাণী সফল হলো। ঐ ধূমকেতুটি লন্ডনের আকাশে আবার ফিরে এসেছিল। সেই থেকেই ঐ ধূমকেতুটির নাম হয়েছে, "হ্যালির ধূমকেতু"। এই ধূমকেতুটির জন্যই এডমন্ড হ্যালি অমর হয়ে আছেন। হ্যালির হিসেব অনুযায়ী এই ধূমকেতুটি প্রায় ৭৬ বছর পরপর ফিরে আসে।

১৯৮৬ সালে হ্যালির ধূমকেতুটি শেষবার দেখা গিয়েছিল। তখন আমরা অনেকেই এই ধূমকেতুটি দেখেছি। এটি আবারো ফিরে আসবে ২০৬১ সালে। তখন অবশ্য আমরা অনেকেই পৃথিবীতে আর থাকবো না। বিখ্যাত এই ধূমকেতুটি দু’বার দেখার বিরল সৌভাগ্য সবার হয় না।

© তানভীর হোসেন

Comments