প্লুটো: বাদ পড়া নবম গ্রহ

ছোটবেলায় পাঠ্য বইতে পড়েছি সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা নয়টি। সূর্য থেকে দূরত্বের ক্রমানুসারে এই নয়টি গ্রহ হলো:  বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শণি, ইউরেনাস, নেপচুন এবং প্লুটো। ১৯৩০ সালে সূর্যের সবচেয়ে দূরবর্তী গ্রহ হিসেবে প্লুটো আবিষ্কৃত হয়েছিলো।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে বলা হচ্ছে, সৌরজগতে গ্রহ রয়েছে আটটি। নবম গ্রহ প্লুটো তার গ্রহের মর্যাদা হারিয়েছে। ২০০৬  সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল ইউনিয়ন (IAU) প্লুটোকে পদাবনতি দিয়ে বামন গ্রহ বা ডুয়ার্ফ প্ল্যানেট আখ্যা দিয়েছে। 

এর কারণ অবশ্য IAU ব্যাখ্যা করেছে। তারা বলেছে সৌরজগতে গ্রহের মর্যাদা পেতে হলে কোন মহাজাগতিক বস্তুকে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে:

প্রথমত:  সূর্য কেন্দ্রিক হতে হবে; দ্বিতীয়ত: হাইড্রোস্ট্যাটিক ইকুলিব্রিয়াম থাকতে হবে, অর্থাৎ মোটামুটি ভাবে গোলাকৃতি হতে হবে;  তৃতীয়ত:  যথেষ্ট ভর বিশিষ্ট হতে হবে, যার ফলে এর চারপাশে একটি পরিষ্কার মহাকর্ষ বলের ক্ষেত্র তৈরি হবে। অর্থাৎ এর চারপাশে অন্য কোন মহাজাগতিক বস্তুর প্রভাব থাকা চলবে না। 

প্লুটো উপরের প্রথম দুটো শর্ত পূরণ করতে পারলেও, তৃতীয় শর্তটিতে এসে মার খেয়ে গেছে। এর কারণ হলো গ্রহ হিসেবে প্লুটো আয়তনে খুবই ছোট। প্লুটোর আয়তন আমাদের পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদের দুই তৃতীয়াংশ। প্লুটোর ব্যাসার্ধ পৃথিবীর ব্যাসার্ধের মাত্র ছয় ভাগের একভাগ। প্লুটোর মহাকর্ষ বল পৃথিবীর মহাকর্ষের মাত্র ১৫ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ পৃথিবীতে আপনার ওজন যদি ৬০ কিলো হয়, প্লুটোতে আপনার ওজন হবে মাত্র ৪ কিলো। বলাই বাহুল্য, প্লুটোতে গেলে আপনি নিজেকে খুবই হালকা বোধ করবেন! 

দুর্বল মহাকর্ষ বলের কারণেই প্লুটো সৌরজগতের এলিট প্ল্যানেটরি ক্লাবের সদস্যপদ হারিয়েছে। তার ভাগ্যে জুটেছে বামন গ্রহের তকমা। প্লুটোর মত সৌরজগতে আরো চারটি বামন গ্রহ রয়েছে। এদের নাম হলো, এরিস, সেরেস, হাউমেয়া এবং মাকিমাকি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্লুটোকে গ্রহের মর্যাদা দিতে হলে, এদেরকেও গ্রহ হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে।  সেজন্য প্লুটোকেই বামন গ্রহ হিসেবে ডিমোশন দেয়া হয়েছে। যদিও এ কারণে অনেকেই সে সময় নাখোশ হয়েছিলেন। অনেকেই প্রতিবাদ করেছিলেন। 

সাইজে ছোটখাটো হলেও, প্লুটোর পাঁচটি উপগ্রহ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উপগ্রহটির নাম হলো, ক্যারন। এর সাইজ প্লুটোর সাইজের অর্ধেক। প্লুটোর গতিবিধির উপর ক্যারনের মহাকর্ষের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। সৌরজগতের প্রান্তসীমায় প্লুটো এবং ক্যারন একত্রে একটি গ্রাভিটেশনাল সিস্টেম হিসেবে কাজ করে। ‌

পৃথিবী থেকে প্লুটোর দূরত্ব  ৫.৩ বিলিয়ন কিলোমিটার। সূর্য থেকে এর দূরত্ব ৫.৯ বিলিয়ন কিলোমিটার। এই দূরত্বে থেকে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে প্লুটোর সময় লাগে পৃথিবীর ২৪৮ বছরের সমান। অর্থাৎ পৃথিবীতে আপনার বয়স এখন ৬২ বছর হলে, প্লুটোতে আপনার বয়স হতো মাত্র তিন মাস। বোঝাই যাচ্ছে, প্লুটোতে থাকতে পারলে হালকা পাতলা থাকার পাশাপাশি চিরশিশু হওয়া যেত!

২০০৬ সালে উৎক্ষেপিত নাসার মহাকাশযান "নিউ হরাইজন" এর প্লুটোর কাছাকাছি পৌঁছাতে সময় লেগেছিল পাক্কা নয় বছর। ২০১৫ সালে নিউ হরাইজন প্লুটোর বেশ কিছু অনবদ্য ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। এরকম একটি ছবিতে প্লুটোর অনন্য উদ্ভাসিত রূপ দেখা যাচ্ছে। বামন হলেও প্লুটোর একটি আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে। বিশেষ বিবেচনায় প্লুটোকে কি তার গ্রহের মর্যাদা আবার ফিরিয়ে দেওয়া যায় না? 

© তানভীর হোসেন

Comments