আজ আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেখানে “ওয়াই-ফাই” শব্দটা প্রায় অক্সিজেনের মতোই জরুরি। অফিসে, ক্যাফেতে, ট্রেনে, এমনকি প্লেনে বসেও আমরা অদৃশ্য এক বেতার তরঙ্গে ভেসে বেড়াই - যার নাম ওয়াই-ফাই। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই আধুনিক প্রযুক্তির শিকড়ে লুকিয়ে আছে এক বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের আশ্চর্য গল্প?
১৯৯২ সালের কথা। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গবেষণা সংস্থা CSIRO এর রেডিওফিজিক্স ল্যাবরেটরিতে বসে এক দল বিজ্ঞানী গবেষণা চালাচ্ছিলেন। এই ল্যাবরেটরিটি ছিল সিডনির উপকণ্ঠে, যদিও CSIRO এর সদর দপ্তর অবস্থিত ক্যানবেরায়। তারা আসলে কৃষি গবেষণায় ব্যবহৃত রেডিও সিগন্যাল বিশ্লেষণ করছিলেন, কিন্তু সেখানেই ঘটল এক যুগান্তকারী মোড়।
দলটির নেতৃত্বে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান পদার্থবিদ জন ও’সালিভান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন টেরি পার্সি, ডিটার হেইনরিখ, গ্রাহাম ড্যানিয়েলসন ও জন ডিন। পদার্থবিদ ও’সালিভান এর আগে কাজ করেছিলেন স্টিফেন হকিংয়ের ব্ল্যাকহোল তত্ত্ব নিয়ে। তাঁর লক্ষ্য ছিল মহাবিশ্ব থেকে আসা অতিক্ষীণ রেডিও তরঙ্গ শনাক্ত করা। সেই গবেষণার সূত্র ধরেই তাঁর মাথায় এলো এক নতুন ধারণা- তরঙ্গের প্রতিফলন ও সংঘর্ষ ব্যবহার করে যদি তারবিহীনভাবে তথ্য আদানপ্রদান করা যায়?
এই চিন্তা থেকেই জন্ম নিল এক বিপ্লবী প্রযুক্তি। ১৯৯৬ সালে তারা তৈরি করলেন Wireless LAN (Local Area Network) প্রযুক্তি, যেখানে ইন্টারনেট সংযোগ সম্ভব হলো বেতার তরঙ্গে। এর পেছনের গাণিতিক কৌশল ছিল “অর্থোগোনাল ফ্রিকোয়েন্সি ডিভিশন মাল্টিপ্লেক্সিং” (OFDM) নামের এক বিশেষ তরঙ্গ-বিভাজন পদ্ধতি, যা একই সঙ্গে অসংখ্য তথ্য বহন করতে পারে কোনো বিঘ্ন ছাড়াই।
এরপর ১৯৯৭ সালে ইন্সটিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার্স (IEEE) এই প্রযুক্তির জন্য নির্ধারণ করে মানদণ্ড IEEE 802.11, যেটিই আজকের ওয়াই-ফাই। ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি মূলত দুটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডে কাজ করে ২.৪ গিগাহার্টজ এবং ৫ গিগাহার্টজ, যার মাধ্যমে বেতার তরঙ্গে তথ্য আদানপ্রদান করা হয়।
১৯৯৯ সালে “Wi-Fi Alliance” গঠিত হয়, যারা বাজারে এর নামকরণ করে Wi-Fi: Wireless Fidelity। নামটা এসেছে “Hi-Fi” থেকে, যার মানে উচ্চমানের সাউন্ড সিস্টেম। উদ্দেশ্য ছিল মানুষ যেন সহজে Wi-Fi নামটা মনে রাখতে পারে।
আজ ওয়াই-ফাই ছাড়া জীবন প্রায় অকল্পনীয়। স্কুলের পড়া থেকে শুরু করে বাড়ির স্মার্ট টিভি, হাসপাতালের যন্ত্র, এমনকি মহাকাশের উপগ্রহ পর্যন্ত সব জায়গায় চলছে এই বেতার যোগাযোগের জাদু। অদৃশ্য রেডিও তরঙ্গ এখন আমাদের বাড়ির দেয়াল ভেদ করে তথ্য বহন করে, ঠিক যেমন করে শত বছর আগে মারকোনি প্রথম রেডিও সিগন্যাল পাঠিয়েছিলেন।
কিন্তু এই প্রযুক্তির সাফল্যের পেছনে ছিল এক দীর্ঘ আইনগত লড়াই। CSIRO তাদের আবিষ্কারের জন্য ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক পেটেন্ট নেয়, যেটা পরে বিশ্বের প্রায় সব বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির (Intel, HP, Dell, Microsoft, Asus, Buffalo Technology ) বিরুদ্ধে আইনি দাবির সূচনা করে। কারণ তারা CSIRO এর অনুমতি ছাড়াই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা শুরু করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বহু বছরের লড়াই শেষে একাধিক কোম্পানি CSIRO এর সঙ্গে সমঝোতায় আসে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয় কয়েক শ মিলিয়ন ডলার।
২০১২ সালের মধ্যে CSIRO প্রায় ৪৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ পায়। এই মামলাগুলো নতুন প্রযুক্তির মেধাসত্ব সুরক্ষার ইতিহাসে এক নজির। সিডনির এক গবেষণাগারের শান্ত ঘরে জন্ম নেওয়া এক ধারণা পরিণত হয়েছিল বিশ্বব্যাপী আদালত-কক্ষের আলোচিত ঘটনায়।
ওয়াই-ফাই কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, এটি মানব মেধার এক চূড়ান্ত উদাহরণ। যেখানে মহাবিশ্বের গভীর থেকে ব্ল্যাকহোলের সিগন্যাল খুঁজতে গিয়ে মানুষ খুঁজে পেয়েছে নিজস্ব যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত।
© তানভীর হোসেন
CSIRO – Commonwealth Scientific and Industrial Research Organisation অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গবেষণা সংস্থার নাম।
Comments