উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, অঁরি পয়েনকেয়ার নামের এক ফরাসি বিজ্ঞানী ও দার্শনিক সময়ের আপেক্ষিকতা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছিলেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, একটি ঘটনা যদি একজন চলন্ত ট্রেনের ভেতর থেকে দেখে, আর আরেকজন বাইরে থেকে দেখে, তাহলে তাদের দুজনের দেখার অভিজ্ঞতা কি এক রকম হবে? তিনি মনে করতেন, সময় সবার জন্য এক নয়; বরং এটা নির্ভর করে কে কোথা থেকে দেখছে এবং কিভাবে সময় মাপছে তার ওপর। তাঁর মতে, সময় একটা সমঝোতা, দুইজন পর্যবেক্ষকের মধ্যে আলো পাঠিয়ে ও ফিরিয়ে এনে সময়ের যে হিসেব পাওয়া যায়, সেটাই ব্যবহারযোগ্য সময়। ১৮৯৮ সালে তাঁর "La mesure du temps" প্রবন্ধে তিনি এই চিন্তাগুলো উপস্থাপন করেন। এরপর ১৯০৪ সালে এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে তিনি বলেন, সব ভৌত নিয়ম সব পর্যবেক্ষকের জন্য একই হওয়া উচিত।
১৯০৫ সালের জুনে তিনি “Sur la dynamique de l’électron” নামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যেখানে লোরেঞ্জ রূপান্তরের (Lorentz transformations) গাণিতিক ধারণা ব্যবহার করে দেখান — কোনো বস্তু আলোর গতির কাছাকাছি চললে তার জন্য সময় ধীরে চলে এবং দৈর্ঘ্য সংকুচিত হয়ে যায়। তবে তিনি স্পষ্টভাবে কখনো বলেননি যে, এটাই আপেক্ষিকতার মূলকথা। তিনি এটিকে লোরেঞ্জের রূপান্তরের একটি গাণিতিক ও দার্শনিক পরিমার্জন হিসেবে লিখেছিলেন, কোনো নতুন স্বতন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে নয়। তাছাড়া লোরেঞ্জের মতো তিনিও ইথারের প্রচলিত ধারণাকেও বাদ দেননি।
অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে, সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরের পেটেন্ট অফিসে কাজ করছিলেন এক অখ্যাত তরুণ আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি ভাবছিলেন, যদি কেউ আলোর গতিতে চলে, তাহলে তার জন্য আলোর রশ্মি কি স্থির হয়ে যাবে? কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব অনুযায়ী, আলো সব পর্যবেক্ষকের জন্য একই গতিতে চলে। তাই তিনি বুঝতে পারলেন, হয় আলোর গতি ব্যতিক্রমী, না হয় সময় ও স্থান নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণাই ভুল।
এই চিন্তার ভিত্তিতে ১৯০৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি “Zur Elektrodynamik bewegter Körper” নামের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যেটা এখন বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। তিনি বলেন, আলোর গতি সব ইনর্শিয়াল পর্যবেক্ষকের জন্য একই, এবং সময় ও স্থান আপেক্ষিক। তিনি ইথারের ধারণাকে একেবারেই বাতিল করে দেন, কারণ সেটা ছিল অপ্রয়োজনীয়। আইনস্টাইন সাহস করে বললেন, যে বস্তু যত দ্রুত চলে, তার জন্য সময় তত ধীরে চলে এবং তার দৈর্ঘ্য সংকুচিত হয়ে যায়। কোনো ঘটনা এক পর্যবেক্ষকের কাছে যে সময়ে ঘটে, সেটা অন্যের কাছে ভিন্ন সময়ে ঘটতে পারে।
আইনস্টাইন তাঁর এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রে লোরেঞ্জের রূপান্তরের কথা উল্লেখ করলেও, পয়েনকেয়ারের গবেষণা নিয়ে কিছু বলেননি। তবে মোদ্দা কথা হলো, যেখানে পয়েনকেয়ার আপেক্ষিকতার এই বিষয়গুলো গাণিতিক পরিসরে আলোচনা করেছিলেন, সেখানে আইনস্টাইন সেগুলোর বাস্তবতা নিয়ে সরাসরি বক্তব্য দেন এবং সাহসিকতার সাথে আপেক্ষিকতার নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। পয়েনকেয়ার হয়তো আরও ভেবেচিন্তে কথা বলতে চেয়েছিলেন, অথবা তিনি লোরেঞ্জের প্রতি সম্মান রেখে নিজের অবস্থান একটু আড়ালে রেখেছিলেন। কিন্তু আইনস্টাইন আপেক্ষিকতা নিয়ে সরাসরি ও স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, যেটা তিনি বিশ্বাস করতেন।
এই কারণেই বিজ্ঞানের ইতিহাসে পয়েনকেয়ারকে সম্মান জানানো হয়, কিন্তু আইনস্টাইনকে মনে রাখা হয়। কারণ তিনিই আপেক্ষিকতার তত্ত্বকে এমনভাবে প্রকাশ করেছিলেন, যাতে সারা বিশ্ব সেটা বুঝতে পারে এবং গ্রহণ করে। তাই বলা যায়, পয়েনকেয়ার আপেক্ষিকতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু এর দরজাটা খুলেছিলেন আইনস্টাইন।
© তানভীর হোসেন
Comments