মানুষের শরীর আসলে এক ধরনের বায়োলজিকাল হিট ইঞ্জিন। অন্যভাবে বলা যায়, এটি একটি জটিল থার্মোডাইনামিক যন্ত্র। আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে যে শক্তির কারখানা চলছে, তার ভিত্তি হলো থার্মোডাইনামিক্সের নিয়ম।
আমাদের খাবারের মধ্যে জমে থাকা রাসায়নিক শক্তি গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়, আর সেই গ্লুকোজ শ্বাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে তৈরি করে এটিপি (Adenosine Triphosphate) নামের এক রাসায়নিক পদার্থ। জীবনের চালিকা শক্তি আসে এই এটিপি থেকে। আমরা যখন হাঁটি, দৌড়াই, হাত নাড়ি, কথা বলি বা চিন্তা করি, এ সবই এটিপি অণু ভাঙনের মাধ্যমে উৎপন্ন শক্তি দিয়ে সম্পন্ন হয়। আর এসবই ঘটে থার্মোডাইনামিক্সের নিয়ম মেনে।
এই নিয়ম বলে, শক্তির ধ্বংস নেই, কিন্তু রূপান্তর আছে। কিন্তু রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন, এনট্রপি। প্রকৃতির নিয়ম হলো, কোনো শক্তির রূপান্তর শতভাগ দক্ষ হয় না। এটাই দ্বিতীয় থার্মোডাইনামিক সূত্র; যেখানে বলা হয়, প্রতিটি শক্তি রূপান্তরের সাথে সঙ্গে এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলা বাড়ে। আমাদের শরীরও এর ব্যতিক্রম নয়।
খাবারের রাসায়নিক শক্তির একটি অংশ কাজে লাগে, বাকিটা ছড়িয়ে যায় তাপ হিসেবে। এভাবে শরীরের অভ্যন্তরে ক্রমাগত শক্তির বিকিরণ বা এনার্জি ডিসিপেশন ঘটে। এই তাপই আমাদের শরীরকে উষ্ণ রাখে, আমাদের ঘাম ঝরায়, কিংবা ঠান্ডা বাতাসে নিঃশ্বাসকে বাষ্পে পরিণত করে। অর্থাৎ, আমরা যতই এটিপির শক্তিকে কাজে লাগাই না কেন, তার একটি অংশ অবধারিতভাবে বিশৃঙ্খলার আকারে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।
একটি গাড়ির ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করলে ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়। গাড়ির ইঞ্জিনে পেট্রোল ঢোকে, অক্সিজেন মেশে, দহন ঘটে, শক্তি উৎপন্ন হয় এবং সেই শক্তিতে গাড়ি চলে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর তাপও বেরিয়ে যায়। মানুষের শরীরেও খাবার হলো জ্বালানি, শ্বাসের অক্সিজেন হলো দহনের উপাদান, আর কোষ হলো সেই দহন থেকে শক্তি উৎপাদনের যন্ত্র। উৎপন্ন শক্তির কিছুটা কাজে লাগে, আর বাকিটা নষ্ট হয়ে যায় তাপ হিসেবে। এই কারণেই আমাদের শরীর কখনোই নিখুঁত ইঞ্জিন নয়; বরং থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র মেনেই আংশিক কার্যকর।
এখানেই আসে এনট্রপির গভীর তাৎপর্য। এনট্রপি হলো প্রকৃতির একধরনের অনিবার্য বিশৃঙ্খলা। আমাদের শরীর যে শক্তি ব্যবহার করছে, প্রতিদিনই সেই প্রক্রিয়ায় এনট্রপি বাড়ছে। প্রকৃতির নিয়ম ধীরে ধীরে শৃঙ্খলা থেকে বিশৃঙ্খলার দিকে যাওয়া। একদিকে এনট্রপি বাড়ছে, অন্যদিকে জীবন দাঁড়িয়ে আছে তার বিপরীতে লড়াই করে।
তাই মানুষকে শুধুমাত্র কেবল একটি রক্তমাংসের প্রাণী বলে ভাবলে ভুল হবে। আমরা আসলে এমন এক বায়োলজিকাল হিট ইঞ্জিন, যার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রতিটি খাবার, প্রতিটি নড়াচড়া থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র মেনে চলে। আর আমাদের প্রতিটি দিনের বেঁচে থাকা হলো শক্তির রূপান্তরের এক ধারাবাহিক নাটক, যেখানে এনট্রপি অবধারিতভাবে বাড়ছে, কিন্তু তার বিপরীতে জীবন তার নিজস্ব শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখার জন্য অবিরাম যুদ্ধ করে যাচ্ছে।
আর এই কারণেই আমরা বুড়ো হই। তরুণ বয়সে শরীরের ইঞ্জিন দক্ষভাবে চলে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কোষ ক্ষয় হতে থাকে, শক্তি উৎপাদন দুর্বল হয়। তারপর একদিন আসে মৃত্যু, যখন জীবনের হিট ইঞ্জিন থেমে যায়। মৃত্যু আসলে থার্মোডাইনামিক্সের অবধারিত ফল।
কিন্তু জীবনের মহিমা এখানেই, এই অনিবার্য বিশৃঙ্খলার মাঝেও মানুষ শৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। আমরা কবিতা লিখি, গান গাই, আবিষ্কার করি, সভ্যতা গড়ি। ক্ষণিকের জন্য হলেও আমরা অন্ধকারে আলো জ্বালাই। আমাদের জীবন হলো, থার্মোডাইনামিক্সের অনিবার্য নিয়মের বিরুদ্ধে অবিরাম বিদ্রোহ।
© তানভীর হোসেন
Comments