স্বপ্নের বিজ্ঞান


রাতের ঘুম নামলেই আমরা প্রবেশ করি আশ্চর্য এক জগতে। আমাদের চোখ বন্ধ, শরীর নিস্তব্ধ, তবু মস্তিষ্ক তখনও অদ্ভুত সব কাহিনি রচনা করতে থাকে। এই কাহিনিগুলোকেই আমরা বলি স্বপ্ন। প্রাচীন যুগে স্বপ্নকে মনে করা হতো দেবতার বার্তা বা ভবিষ্যতের জন্য কোন ইঙ্গিত। আবার কারো কাছে ছিল মানুষের অবচেতন মনের রহস্যময় জগত। কিন্তু আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান স্বপ্নকে আজকাল একেবারেই নতুন চোখে দেখছে।

বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, মানুষের ঘুম একটানা হয় না, বরং কয়েকটি ধাপে এগোয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর ধাপটি হলো, র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) বা রেম ঘুম। এই সময় চোখের পাতা বন্ধ থাকলেও ভেতরে চোখের মণি দ্রুত নড়তে থাকে, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, আর মস্তিষ্ক যেন জেগে ওঠে। ঠিক এই মুহূর্তেই সবচেয়ে জীবন্ত স্বপ্নেরা এসে ধরা দেয়। 

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই সময় মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা নামের যে অংশ মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং হিপোক্যাম্পাস নামের যে অংশ স্মৃতি সংরক্ষণ করে, সেগুলো ভীষণ সক্রিয় হয়ে ওঠে। দিনের অভিজ্ঞতা, আবেগ আর স্মৃতি তখন মিলেমিশে যায়, আর মস্তিষ্ক তৈরি করে স্বপ্নের বিচিত্র সব কাহিনি। অথচ একই সময়ে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যেটা মস্তিষ্কের যুক্তি-তর্কের কাজ করে, দিনের বেলার তুলনায় অনেক কম সক্রিয় থাকে। তাই স্বপ্নে অসম্ভব ঘটনাকেও আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। এসময় আকাশে উড়ে বেড়ানো, মৃত মানুষকে জীবিত দেখা কিংবা অবাস্তব কোন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়াটা বিচিত্র নয়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে স্বপ্ন কেবল কল্পনার খেলা নয়, এর ভেতরে রয়েছে গভীর স্নায়বিক তাৎপর্য। রেম ঘুমে আসতে দেরি হলে সেটা ভবিষ্যতে আলজেইমার্স রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কারণ তখন মস্তিষ্কে ক্ষতিকর প্রোটিন জমে এবং নতুন নিউরন তৈরির জন্য সাহায্যকারী উপাদান কমে যায়। আবার কেবল রেম নয়, ঘুমের অন্য ধাপ নন-রেম পর্যায়েও মানুষ স্বপ্ন দেখে। যদিও সেগুলো তেমন অলীক স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তব ভাবনা ও মানসিক টানাপোড়েনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন স্বপ্নকে “ইঞ্জিনিয়ারিং” করার, অর্থাৎ ঘুমের সময় নির্দিষ্ট শব্দ, গন্ধ বা চিন্তার ইঙ্গিত দিয়ে স্বপ্নের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি না সেটা তারা পরীক্ষা করছেন। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয়, টার্গেটেড মেমোরি রিঅ্যাক্টিভেশন। এতে নেতিবাচক স্মৃতি দুর্বল হয়ে যায় আর ইতিবাচক স্মৃতি আরও শক্তিশালী হয়। এটি ভবিষ্যতে মানসিক রোগ বা ট্রমার চিকিৎসায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

স্বপ্নকে মাঝে মাঝে এত বাস্তব মনে হয় কেন, তারও ব্যাখ্যা আজ অনেকটাই পরিষ্কার। রেম ঘুমের সময় ডোপামিন ও অ্যাসিটাইলকোলিনের মতো রাসায়নিক পদার্থগুলো সক্রিয় থাকে, আর এগুলো আমাদের উপলব্ধিকে আরো তীব্র করে তোলে। সেজন্যই স্বপ্নকে অনেক সময় বাস্তব মনে হয়। স্বপ্ন তখন যেন দূরের সিনেমার পর্দা নয়, একেবারে বাস্তবের মতো অভিজ্ঞতা। স্বপ্নের ভেতর আমরা তখন যেন নিজেরাই অভিনয় করি। এ কারণেই জেগে ওঠার পর অনেক স্বপ্ন নিমিষেই মিলিয়ে যায়। আবার কিছু স্বপ্ন সারাদিন মনের ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে।

ইতিহাসে আমরা দেখেছি, অনেক সৃজনশীল আবিষ্কার ও সৃষ্টির বীজ বোনা হয়েছে স্বপ্নে। কথিত আছে, রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্ডেলেভ স্বপ্নে মৌলিক পদার্থের বিন্যাস দেখে তৈরি করেছিলেন আধুনিক পর্যায় সারণি বা পিরিয়ডিক টেবিল। জার্মান রসায়নবিদ কেকুলে স্বপ্নে দেখেছিলেন এক সাপ নিজের লেজ কামড়ে বৃত্ত তৈরি করছে, আর সেখান থেকেই তাঁর মাথায় আসে বেনজিনের রিং কাঠামো। সাহিত্যিক মেরি শেলি এক ঝড়ের রাতে স্বপ্নে মৃতদেহ থেকে জীবন্ত সত্ত্বা তৈরির কাহিনি দেখেছিলেন, যা থেকে জন্ম নেয় তাঁর কালজয়ী কল্প কাহিনী, ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। আবার বিটলসের গায়ক পল ম্যাকার্টনি একদিন ঘুম থেকে উঠে শুনলেন তার মাথার ভেতর বাজছে অচেনা এক সুর, যেটা পরে বিটলসের অমর গান ইয়েস্টারডেতে রূপ নেয়। এমনকি আইনস্টাইনের আত্মজীবনী থেকে আমরা জানতে পারি, কিশোর বয়সে স্বপ্নে নিজেকে আলো রশ্মির উপর ভেসে যেতে দেখেছিলেন, যেখান থেকে তাঁর আপেক্ষিকতা নিয়ে চিন্তাভাবনার সূত্রপাত হয়েছিল। 

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক স্বপ্ন সাধারণত সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক হয়। আর নেতিবাচক স্বপ্ন হয় বিশৃঙ্খল ও ভাঙাচোরা; মস্তিষ্ক যেন আবেগের চাপ ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে। আরেক বিস্ময়কর তথ্য হলো, লুসিড ড্রিম বা সচেতন স্বপ্নে মস্তিষ্কের সামনের অংশ, বিশেষ করে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ও ভিজ্যুয়াল এলাকার সংযোগ হঠাৎ তীব্রভাবে বেড়ে যায়। তখন স্বপ্নদর্শী বুঝতে পারে যে সে স্বপ্ন দেখছে এবং কখনো কখনো স্বপ্নের ঘটনাকেও নিজের মতো করে চালাতে পারে।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও কাজে লাগানো হচ্ছে স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য। সম্প্রতি তৈরি হওয়া এক ডিপ লার্নিং এ আই সিস্টেম মানুষের স্বপ্নের বর্ণনা বিশ্লেষণ করে প্রায় নির্ভুলভাবে স্বপ্নের আবেগ ও বিষয়বস্তু চিহ্নিত করতে পেরেছে। এ থেকে ধারণা করা যায়, ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের স্বপ্নের অর্থ বুঝে ফেলা বা মানসিক রোগের চিকিৎসায় এ আই ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

আজকের বিজ্ঞান ধীরে ধীরে শিখছে কীভাবে স্বপ্নকে কাজে লাগানো যায় মানুষের মানসিক সুস্থতা, সৃজনশীলতা আর চেতনার গভীর রহস্য বোঝার জন্য। তবে এখনো স্বপ্নের রহস্য পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি, তবু এটুকু স্পষ্ট যে, স্বপ্ন আসলে মস্তিষ্কের এক বিস্ময়কর কর্মযজ্ঞ, যেখানে স্মৃতি, আবেগ আর কল্পনা সব মিলেমিশে তৈরি হয় আশ্চর্য এক পরাবাস্তবতা।

© তানভীর হোসেন

Comments