অধ্যাপক এডওয়ার্ড উইলসন ছিলেন একজন প্রকৃতিবিদ। ছেচল্লিশ বছর তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও গবেষণা করেছেন। তিনি গবেষণার কাজ শুরু করেছিলেন পিঁপড়েদের সংঘবদ্ধ সামাজিক জীবন নিয়ে। এ নিয়ে গবেষণা করার জন্য তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তরে। খুব কাছ থেকে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন পিঁপড়েদের সামাজিক জীবন ও কার্যকলাপ। এ ব্যাপারে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ। তিনি দেখিয়েছেন, পিঁপড়েরা খুব সহজেই ফেরোমনের সাহায্যে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। পিঁপড়েদের জীবন নিয়ে নিবিড় গবেষণা করে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রাকৃতিক ভাবেই পিঁপড়েরা তাদের সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলো বংশ-পরম্পরায় ধারণ ও বহন করে চলেছে। এভাবেই তারা তাদের জীব বৈচিত্র্যকে রক্ষা করে।
পরবর্তীতে তিনি মানুষ সহ অন্যান্য প্রাণীর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও আচরণের ক্ষেত্রেও পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব লক্ষ্য করেছেন। তাঁর দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার ফলে জীববিজ্ঞানের একটি নতুন শাখার গোড়াপত্তন হয়। যাকে বলা হয়, সোশিওবায়োলজি বা সামাজিক জীববিজ্ঞান। জীবের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পারিপার্শ্বিক সামাজিক অবস্থার মাধ্যমে কিভাবে প্রভাবিত হয় সেটা নিয়ে গবেষণা করাটাই সামাজিক জীববিজ্ঞানের প্রতিপাদ্য বিষয়। তিনি মনে করতেন, জীবের সামগ্রিক সামাজিক আচরণের পেছনে বংশগতির পাশাপাশি পরিবেশের প্রবল প্রভাব রয়েছে। তাঁর মতে এটি জীব বিবর্তনের একটি মূল চালিকাশক্তি। তবে এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে তিনি অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। পঞ্চাশের দশকে ডিএনএ ডাবল হেলিক্স কাঠামোটি আবিষ্কার হবার পর জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। মলিকিউলার বায়োলজিই হয়ে ওঠে জীববিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করার তীর্থক্ষেত্র। কিন্তু তিনি তাঁর কাজের ক্ষেত্র হিসেবে সামাজিক জীববিজ্ঞান বা সোশিওবায়োলজিকেই বেছে নিয়েছিলেন।
১৯৭৮ সালে, এ বিষয়ে তিনি On Human Nature নামে একটি উল্লেখযোগ্য বই প্রকাশ করেন, যেটা পুলিৎজার পুরস্কার অর্জন করে। বইটিতে উইলসন দেখানোর চেষ্টা করেছেন, মানুষকে শুধু “সাংস্কৃতিক প্রাণী” মনে করা যথেষ্ট নয়, বরং মানুষের সামাজিক আচরণের গভীরে রয়েছে বিবর্তনীয় শক্তি আর বংশগতির ছাপ। তিনি মানুষের যৌনতা, পরিবারিক কাঠামো, আত্মীয়তা, আক্রমণাত্মক প্রবণতা, মানসিক গঠন, এমনকি ধর্মীয় অনুভূতি ও নৈতিক চেতনার মতো জটিল বৈশিষ্ট্যগুলোকেও সামাজিক জীববিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়, বরং প্রকৃতিরই এক বিবর্তিত রূপ। তাই মানব প্রকৃতি বুঝতে হলে মানুষের পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য আর পরিবেশের প্রভাবকে একসাথে বিবেচনা করতে হবে।
এইভাবেই উইলসন দেখিয়েছিলেন, বিবর্তন শুধু শরীরের গঠনকেই বদলায়নি, বদলেছে মানুষের চিন্তাভাবনা, নৈতিকতার ধারণা আর সমাজজীবনের ভিত্তি। তাঁর আলোচনায় মানুষের বংশগতি, যৌনতা, ধর্মীয় অনুভূতি, আশা-নিরাশা, এসব কিছুরই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। জীববিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রী সহ বিজ্ঞানে আগ্রহী সবার জন্যই এই বইটি এক অনন্য পাঠ্য, কারণ এর ভেতরে মানুষকে বোঝার এক নতুন দরজা উন্মুক্ত করা হয়েছে।
Comments