পল ডিরাক (১৯০২ – ১৯৮৪)


গতকাল ছিল ৮ আগস্ট। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাকের জন্মদিন। ১৯০২ সালের এই দিনে তিনি জন্মেছিলেন ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে। বিংশ শতাব্দীর কোয়ান্টাম বিপ্লবের অন্যতম প্রধান স্থপতি ডিরাক, বিশেষ করে কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্সের বিকাশে তাঁর অবদান অনন্য।

তাঁর সবচেয়ে যুগান্তকারী অবদান হলো, বিখ্যাত ডিরাক সমীকরণ। এই সমীকরণের আগে পদার্থবিদদের কাছে একটি বড় সমস্যা ছিল, ক্ষুদ্র কণার আচরণ বোঝাতে ব্যবহৃত কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং আলোর কাছাকাছি গতিতে চলমান বস্তুর আচরণ বোঝাতে ব্যবহৃত আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা, এই দুটি তত্ত্বকে একসাথে মেলানো যাচ্ছিল না। 

ডিরাক তাঁর গাণিতিক প্রতিভার জোরে এই দুই ভিন্ন তত্ত্বকে এক সূত্রে বেঁধে ফেললেন। তাঁর সমীকরণ শুধু ইলেকট্রনের স্পিনের রহস্য উন্মোচন করেনি, বরং এক নতুন কণার অস্তিত্বেরও পূর্বাভাস দিয়েছিল। এর নাম পজিট্রন, অর্থাৎ ইলেকট্রনের প্রতিপদার্থ। সেই সময় এটি ছিল একেবারেই বৈপ্লবিক ধারণা। এর কয়েক বছর পর, ১৯৩২ সালে, কার্ল অ্যান্ডারসনের পরীক্ষায় সত্যিই পজিট্রন আবিষ্কৃত হয়, যেটা ডিরাকের ভবিষ্যদ্বাণীকে বাস্তবে প্রমাণ করলো এবং প্রতিপদার্থের ধারণাকে বিজ্ঞান জগতে প্রতিষ্ঠিত হলো।

১৯৩৩ সালে পল ডিরাক পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, আরেক বিখ্যাত পদার্থবিদ এরভিন শ্রোডিঙ্গারের সঙ্গে যৌথভাবে। ডিরাক দীর্ঘদিন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতশাস্ত্রে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ লুকেশিয়ান প্রফেসরের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, যে পদে একসময় স্যার আইজ্যাক নিউটনও ছিলেন। তিনি রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে তিনি স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে পল ডিরাক ছিলেন প্রায় কিংবদন্তি-সম মিতভাষী। সহকর্মীদের রসিক মন্তব্য ছিল, তিনি নাকি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ দুইটি বাক্য বলেন। অল্প কথার মানুষ হলেও, তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের গভীর সাধক। জীবনের শেষ সময়ে তিনি পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক প্রশ্নগুলির সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যান। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতির নিয়মগুলির ভেতরে একটি গভীর গাণিতিক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, আর সেই সৌন্দর্যই বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সত্যকে প্রকাশ করে।  তিনি একবার বলেছিলেন, “গণিতের সৌন্দর্যই হলো সত্যিকারের বিজ্ঞানচর্চার পথপ্রদর্শক।”

১৯৮৪ সালের ২০ অক্টোবর ফ্লোরিডায় তাঁর মৃত্যু হয়।  ক্ষণজন্মা এই মেধাবী বিজ্ঞানীর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

Comments