আজ প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আরভিন শ্রোডিঙ্গারের জন্মদিন। ১৮৮৭ সালের আগস্ট মাসের ১২ তারিখে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন বিজ্ঞানী। তাঁর কাজ কারবার ছিলো কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে। অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণাদের চরিত্র ব্যাখ্যা করতে হলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাহায্য নিতে হয়। বিজ্ঞানীরা জানেন বস্তুকণাদের চরিত্র বড়ই বিচিত্র। ক্লাসিক্যাল পদার্থ বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম এরা মানে না। বস্তুকণারা চলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম অনুসারে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়মে বস্তুকণারা একই সাথে কণা এবং তরঙ্গ দুই অবস্থায় থাকতে পারে। এই কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার ধারণাটি প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন ফরাসি বিজ্ঞানী লুই দ্য ব্রয়ী, আর শ্রোডিঙ্গারের কাজ সেই ধারণার গাণিতিক ভিত্তি দেয়।
১৯২৬ সালে শ্রোডিঙ্গারই সর্বপ্রথম তাঁর ওয়েভ ফাংশন সমীকরণের সাহায্যে বস্তুকণার কোয়ান্টাম অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এটি ছিল একটি পার্শিয়াল ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন। কিন্তু এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বস্তুকণার কোয়ান্টাম অবস্থানের সম্ভাব্যতা জানা যায়। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্ষেত্রে এটি ছিলো একটি মাইলফলক। এই আবিষ্কারটির জন্য ১৯৩৩ সালে তিনি পল ডিরাকের সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের ক্ষেত্রে যেমন কাজে লাগে নিউটনের সমীকরণ, তেমনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্ষেত্রে কাজে লাগে শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ। তাঁর এই সমীকরণটির জন্যই তিনি পদার্থবিজ্ঞানের জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। আজ জন্মদিনে তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
বিজ্ঞানী মহলে শ্রোডিঙ্গারের আরেকটি ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে বিড়াল দিয়ে তাঁর সুবিখ্যাত পরীক্ষাটির জন্য। যদিও আসল বিড়াল নিয়ে তিনি কোন পরীক্ষাই করেননি। এটা তাঁর চিন্তা ভাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটা ছিল একটি থট এক্সপেরিমেন্ট।
প্রথমে তিনি একটি কাল্পনিক বিড়ালকে বাক্সে বন্দি করার কথা চিন্তা করলেন। তারপর বাক্সটির মধ্যে বিড়ালের সাথে তিনি খুবই সামান্য পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ রাখলেন। সাথে রাখলেন একটি বোতল, যার ভেতরে রাখা আছে একটি বিষাক্ত গ্যাস। সেই সাথে তেজস্ক্রিয়তা মাপার জন্য তিনি একটি গাইগার কাউন্টার যন্ত্রও জুড়ে দিলেন। যন্ত্রটির সাথে একটি হাতুড়ি এমনভাবে রাখা হলো যাতে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে যন্ত্রটির কাঁটা নড়ে উঠলেই হাতুড়িটি গিয়ে পড়বে ঐ বিষের বোতলটির উপর। ফলে বোতল ভেঙ্গে বাক্সের ভেতর বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়বে। তখন এর তীব্র বিষক্রিয়ায় বিড়ালটি সাথে সাথে মারা যাবে। বিড়ালটির জীবন মরণ অবশ্য নির্ভর করছে অতি সামান্য পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থটির উপর। যেটি প্রতি ঘন্টায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে পারে, আবার নাও পারে। মোদ্দা কথা হলো, পরমাণু তেজস্ক্রিয়তা ছড়ালে বিড়ালটি মারা যাবে আর না ছড়ালে বিড়ালটি বেঁচে থাকবে।
এখন শ্রোডিঙ্গারের প্রশ্ন হলো, তাহলে এক ঘন্টা পর বাক্সের ভেতর বিড়ালটি জীবিত থাকবে নাকি মারা যাবে? বাক্স খুললে অবশ্যই অতি সহজেই জানা যাবে বিড়ালটি বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে। কিন্তু বাক্স না খুলে হলফ করে কি বলা যাবে বিড়ালটি জীবিত নাকি মৃত? নাকি বাক্সের ভেতর বিড়ালটি একই সাথে জীবিত এবং মৃত দুই অবস্থায়ই রয়েছে। আসলে তেজস্ক্রিয় ক্ষয় এমন এক প্রক্রিয়া, যা পুরোপুরি অনিশ্চিত। আগে থেকে কেউ বলতে পারে না কখন সেটা ঘটবে। তাই এক ঘন্টা সময়ের মধ্যে তেজস্ক্রিয় ক্ষয় হবে কি হবে না, কোয়ান্টাম জগতে এ দুটো সম্ভাবনা একই সাথে বিদ্যমান থাকে, যতক্ষণ না আমরা সেটাকে পর্যবেক্ষণ করি। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে একে বলা হয় “সুপারপজিশন”, যেখানে কোন কণা একসাথে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে। যেহেতু বিড়ালের জীবন-মরণ এই তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের সাথে জড়িয়ে আছে, তাই বিড়ালটিকে বাক্সের ভেতরে একই সাথে “জীবিত” এবং “মৃত”, দুই অবস্থাতেই রয়েছে বলে ধরে নেয়া যাবে!
কিন্তু বাস্তব জগতে এটা একেবারেই অসম্ভব। শ্রোডিঙ্গার বিড়াল নিয়ে তাঁর এই কাল্পনিক পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, কোয়ান্টাম জগতে সুপারপজিশনের ধারণাটি ব্যাখ্যা করা গেলেও, আমাদের দৃশ্যমান পারিপার্শ্বিক জগতে এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়াটা কঠিন। কোয়ান্টাম জগতের নিয়মকানুনগুলো আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতের চেয়ে অনেক আলাদা। বিজ্ঞানীরা অবশ্য নানাভাবে এর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, কোন পর্যবেক্ষক যে মুহূর্তে কোন বস্তুকে পর্যবেক্ষণ করেন সে মুহূর্তেই ঐ বস্তুর ওয়েভ ফাংশনের অবসান ঘটে। সেজন্য দৃশ্যমান জগতে একই বস্তুকে একাধিক অবস্থানে আমরা দেখতে পাই না। প্রকৃতপক্ষে, গাণিতিকভাবে কোয়ান্টাম জগতের ব্যাখ্যা দেওয়া গেলেও এর অন্তর্নিহিত রহস্য এখনো মানুষের অজানা। সেজন্যই হয়তো নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান একবার মজা করে বলেছিলেন, "তুমি যদি মনে কর, কোয়ান্টাম মেকানিক্স বুঝে গেছো, তাহলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স তুমি কিছুই বোঝনি"।
© তানভীর হোসেন
Comments