আলোর তরঙ্গ আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু বিজ্ঞানের গভীর দৃষ্টিতে দেখলে, আলো কেবল একটি অবিচ্ছিন্ন তরঙ্গ নয়, এটি অসংখ্য ক্ষুদ্র কণার সমষ্টি। সেই কণার নাম ফোটন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফোটনের কোনো স্থির ভর নেই; এটি পুরোপুরি ভরহীন কণা। তবুও তার রয়েছে ভরবেগ। এটা কিভাবে সম্ভব?
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সূত্র অনুযায়ী, ভরবেগ কেবল মাত্র ভরের কারণে হয় না, এর সাথে শক্তিরও সম্পর্ক রয়েছে। ফোটনের শক্তি আছে এবং সেই শক্তিই তাকে ভরবেগ দেয়। এজন্যই সূর্যের আলো মহাকাশের ধূলিকণার উপর রেডিয়েশন প্রেসার সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ, ভরহীন হয়েও ফোটন বস্তুর উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ফোটনের ভরবেগের দুটি দিক আছে। প্রথমটি হলো অক্ষীয় কৌণিক ভরবেগ (Spin Angular Momentum); সহজভাবে কল্পনা করতে পারেন, যেন একটি ক্ষুদ্র লাটিম নিজের অক্ষের উপর ঘুরছে। এটাকে বলা হয় স্পিন। এটা যদি ডান দিকে ঘুরে, তাহলে বলা হয় ডান-বাহু স্পিন (+১), আর বাম দিকে ঘুরলে হয় বাম-বাহু স্পিন (–১)। এই ধরনের ঘূর্ণনের ধারণাটা মূলত আলোর পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ থেকে এসেছে।
দ্বিতীয়টি হলো কক্ষীয় কৌণিক ভরবেগ (Orbital Angular Momentum বা OAM)। এটি আলোর তরঙ্গের আবর্তনের ধরণ থেকে তৈরি হয়। মনে করুন, আলো সোজা না গিয়ে সর্পিল পথে এগোচ্ছে, যেন একটি প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। এই আবর্তনের তরঙ্গরূপ থেকেই জন্ম নেয় ফোটনের কক্ষীয় কৌণিক ভরবেগ।
অর্থাৎ স্পিন হলো ফোটনের নিজস্ব অক্ষের উপর ঘূর্ণন, আর কক্ষীয় ভরবেগ হলো আলোর তরঙ্গের বাহ্যিক আবর্তন। এই দু’টি মিলেই আলোর বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য গড়ে তোলে।
কোয়ান্টাম তত্ত্ব বহু আগেই জানিয়েছিল ফোটন কখনো তরঙ্গ, আবার কখনো কণা, এ দুই রূপেই প্রকাশ পায়। কিন্তু সম্প্রতি এক যুগান্তকারী পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, একটি মাত্র ফোটনের কক্ষীয় কৌণিক ভরবেগকেও বিভাজন করা সম্ভব। আর সেই বিভাজনের ভেতর দিয়েই আবারও প্রমাণিত হলো প্রকৃতির মৌলিক নিয়মগুলোর অটলতা।
ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি, সম্প্রতি ফিনল্যান্ডের টাম্পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কোটি কোটি ফোটনের মধ্যে থেকে একক ফোটন আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন। তারপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই ফোটনের কক্ষীয় কৌণিক ভরবেগকে বিভাজন করেছেন। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। বিভাজিত ভরবেগের অংশগুলোর স্পিনের মান একে অপরকে বিপরীত দিকে সামঞ্জস্য করেছে। একটির মান ছিল +১, আরেকটির –১, ফলে যোগফল দাঁড়াল শূন্য। অর্থাৎ, সংরক্ষণশীলতার নিয়ম একক ফোটনের ক্ষেত্রেও অটুট রইল, যেমনটি বহু ফোটনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।
কাজটি অবশ্য তেমন সহজ ছিল না। কোটি কোটি ফোটনের মধ্যে সফলভাবে বিভাজন শনাক্ত হয়েছে এক বিলিয়নেরও কম ফোটনে। পরীক্ষার স্থায়িত্বও ছিল দীর্ঘ, প্রায় ১৬৮ ঘণ্টা অবিরাম পর্যবেক্ষণ চালিয়ে বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করতে পেরেছেন মাত্র ৫৭টি সফল বিভাজন। বলা চলে, খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই কঠিন এক পরীক্ষা। এজন্য ব্যবহার করা হয়েছে অত্যন্ত সংবেদনশীল ফোটন শনাক্তকারী যন্ত্র আর নিখুঁত পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি।
এই কঠিন পরীক্ষার ফলাফল আমাদের সামনে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এটি স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, প্রকৃতির মৌলিক নিয়মাবলী, বিশেষ করে সমতা ও সংরক্ষণের নিয়ম, ক্ষুদ্রতম স্তরেও একইভাবে অটুট থাকে। এমনকি একটি মাত্র ফোটনের ক্ষেত্রেও কক্ষীয় কৌণিক ভরবেগ সংরক্ষিত থাকে।
এই আবিষ্কার কেবল মৌলিক পদার্থবিদ্যার নতুন প্রমাণই নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বয়ে আনতে পারে বিপুল সম্ভাবনা। যদি আমরা ফোটনের বিভাজন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখি, তবে তৈরি হবে আরও শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার, নিরাপদ কোয়ান্টাম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং এমন সংবেদনশীল যন্ত্র, যেগুলো দিয়ে মহাবিশ্বের সূক্ষ্মতম ঘটনাও মাপা যাবে নিখুঁতভাবে।
প্রকৃতি যেন বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তার নিয়মগুলো ভাঙার নয়। ফোটনের বিভাজন পরীক্ষা আবারও দেখিয়ে দিল, প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়ম থেকে কখনো বিচ্যুত হয় না।
তথ্যসূত্র: ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস, ২০ মে ২০২৫।
Comments