কোয়ান্টাম কম্পিউটার: প্রযুক্তির পরবর্তী বিপ্লব

কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে অনেকেই “ভবিষ্যতের কম্পিউটার” বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই ভবিষ্যৎ আর বেশি দূরে নয়।‌ এখনই আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। এক সময় যেমন বিদ্যুৎ, টেলিফোন বা ইন্টারনেট মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল পাল্টে দিয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবেই কোয়ান্টাম কম্পিউটারও প্রযুক্তি-বিশ্বে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করতে চলেছে। বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই এর প্রথম কার্যকরী সংস্করণ বানিয়ে ফেলেছে এবং প্রতিদিন সেটিকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমাদের চারপাশে অদৃশ্য এক নীরব দৌড় চলছে, কে আগে সেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করবে, যেটা মুহূর্তের মধ্যে এমন সব হিসেব করে ফেলবে, যা করতে বর্তমানের সুপার কম্পিউটারের হাজার বছর সময় লাগে।

সাধারণ কম্পিউটারের প্রসেসর বিট ব্যবহার করে কাজ করে। বিট হয় শুন্য (০) অথবা এক (১), যেমন সুইচ হয় অন বা অফ। কোয়ান্টাম কম্পিউটারে সেই বিটের জায়গা নেয় ‘কিউবিট’। কিউবিটের বিশেষত্ব হলো, এটি একসাথে ০ এবং ১ দুটো অবস্থায়ই থাকতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয়, ‘সুপারপজিশন’। এর সাথে আছে আরেকটি বিস্ময়কর ক্ষমতা, 'এনট্যাঙ্গলমেন্ট'। দুটি কিউবিট একবার এনট্যাঙ্গেলড হলে, একটির পরিবর্তন সঙ্গে সঙ্গে অন্যটিতে প্রভাব ফেলে, তারা যত দূরেই থাকুক না কেন। এই দুই বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটার একই সঙ্গে অসংখ্য সম্ভাবনার হিসেব করতে পারে, যেটা সাধারণ কম্পিউটারকে করতে হয় ধাপে ধাপে।

এই প্রযুক্তির দৌড়ে এখন বিশ্বের সেরা কিছু প্রতিষ্ঠান ও দেশ নেমে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইবিএম ২০১৯ সালে “আইবিএম কোয়ান্টাম সিস্টেম ওয়ান” চালু করেছিল, যেটা ছিল তাদের প্রথম  কোয়ান্টাম কম্পিউটার। এরপর ২০২২ সালে তারা তৈরি করেছে “অসপ্রে” নামের ৪৩৩ কিউবিটের প্রসেসর এবং ২০২৩ সালে “কনডর” নামের ১,১২১ কিউবিটের প্রসেসর। বর্তমানে তারা “স্টারলিং” নামে একটি ফল্ট-টলারেন্ট কোয়ান্টাম সিস্টেম তৈরি করছে। 

গুগল ২০১৯ সালে ঘোষণা করে, তাদের ৫৩ কার্যকর কিউবিটের “সাইকামোর” প্রসেসর মাত্র ২০০ সেকেন্ডে এমন একটি জটিল হিসেব সম্পন্ন করেছে, যা প্রচলিত সুপারকম্পিউটার করলে প্রায় দশ হাজার বছর সময় লাগত। এই ঘটনাকে তারা বলেছে ‘কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি’।

অন্যদিকে মাইক্রোসফট ভিন্ন পথে এগোচ্ছে। তারা ‘টপোলজিকাল কিউবিট’ তৈরির চেষ্টা করছে, যেটা আরও স্থিতিশীল ও ত্রুটিমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। মাইক্রোসফটের লক্ষ্য আগামী এক দশকের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর টপোলজিকাল কিউবিট প্রযুক্তি বাজারে আনা।

কানাডার ডি-ওয়েভ ভিন্নধর্মী ‘কোয়ান্টাম অ্যানিলিং’ প্রযুক্তি তৈরি করেছে। এটা জটিল অপ্টিমাইজেশন সমস্যার সমাধানে বিশেষভাবে উপযোগী এবং ইতিমধ্যেই শিল্পখাতে ব্যবহার হচ্ছে। চীনের বিজ্ঞানীরা তাদের ‘জিউঝাং’ ফোটন-ভিত্তিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার দিয়ে জটিল কিছু হিসেব সুপারকম্পিউটারের তুলনায় বহুগুণ দ্রুত করে দেখিয়েছেন।
জাপানে ফুজিৎসু ও টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় মিলে ৬৪ কিউবিট ক্ষমতার একটি সিস্টেম বানিয়েছে, যেটা শিল্পখাতে পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। ইউরোপে নেদারল্যান্ডসের কোটেক, ফ্রান্সের সরকার-সমর্থিত এটোস প্রকল্প এবং যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সেন্টার কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষায় ব্যস্ত।

আজকের দিনে নতুন ওষুধ তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের বিশাল পরিমাণ ডেটা এনালাইসিস করতে হয়, যেখানে প্রচলিত সুপার কম্পিউটারও অনেক সময় ধীরগতির হয়ে পড়ে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার জটিল প্রোটিন ফোল্ডিং প্রক্রিয়া খুব সহজেই বিশ্লেষণ করতে পারে। এটা ক্যান্সার, আলঝেইমার্স এবং কোভিড-১৯-এর মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং এবং বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত বিশাল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটার অতি দ্রুত ট্রেডিং অ্যালগরিদম তৈরি করতে পারে, যেটা এক মুহূর্তের মধ্যে স্টক মার্কেটের ওঠানামা বিশ্লেষণ করতে পারবে। মরগ্যান স্ট্যানলি এবং জেপি মরগ্যানের মতো বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কৌশল উন্নত করার চেষ্টা করছে।

আজকের দিনে অনলাইন নিরাপত্তা বা সাইবার সিকিউরিটি নির্ভর করে এনক্রিপশনের ওপর। এগুলো বড় বড় সংখ্যার গুণ-ভাগ করার জটিলতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। প্রচলিত কম্পিউটারের পক্ষে এই এনক্রিপশন ভাঙতে প্রচুর সময় লাগে। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার, বিশেষ করে শোর’স অ্যালগরিদম ব্যবহার করে, এটি খুব দ্রুত ভেঙে ফেলতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম-প্রুফ এনক্রিপশন তৈরি করা হবে, যেটা আরও নিরাপদ হবে এবং হ্যাকিং প্রতিরোধ করবে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক তৈরি হবে।

বিশ্বের জলবায়ু মডেলিং অত্যন্ত জটিল এবং সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রচলিত কম্পিউটারের গতি এতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার জলবায়ুর পরিবর্তনের নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। এর ফলে কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বড় বড় ডেটাসেট বিশ্লেষণ এবং প্যাটার্ন শনাক্তকরণে কোয়ান্টাম কম্পিউটার অনন্য। এটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর ক্ষেত্রে এক বিপ্লব আনতে পারে। মুখ চিনতে পারার সফটওয়্যার, ভাষা অনুবাদ, এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সিস্টেমের দক্ষতা আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার।

এখানে বলে রাখি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিউবিট অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সামান্য তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে এর স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই সমস্যা ডিকোহেরেন্স নামে পরিচিত। এজন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে প্রায় শূন্য কেলভিন তাপমাত্রায় রাখতে হয়, এটা খুবই ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। এছাড়া কিউবিট যত বাড়ে, তত বাড়ে ‘এরর কারেকশন’ বা ত্রুটি সংশোধনের জটিলতা। এই কারণেই আজও কোয়ান্টাম কম্পিউটার সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে এখনো অনেকটা পথ বাকি। এছাড়াও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের জন্য নতুন ধরনের সফটওয়্যার এবং অ্যালগরিদম দরকার। প্রচলিত কম্পিউটারের প্রোগ্রামিং ভাষা এখানে কাজ করে না, তাই নতুন করে সফটওয়্যার ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।

তবুও বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। যেদিন পূর্ণাঙ্গ, স্থিতিশীল কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হবে, সেদিন ওষুধ আবিষ্কার, নতুন রাসায়নিক উপাদান তৈরি, জলবায়ু মডেলিং, আর্থিক বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই শুরু হবে এক নতুন যুগ। সময়টা হয়তো এক দশক পর, হয়তো বা আরও বেশি। কিন্তু এই পথের শেষপ্রান্তে অপেক্ষা করছে কম্পিউটিংয়ের এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি কেবল দ্রুত কম্পিউটিং নয়, বরং মানব সভ্যতার চিন্তাধারা পাল্টে দেওয়ার মতো একটি অনন্য আবিষ্কার হতে যাচ্ছে।

Comments