ফিরে দেখা: মঙ্গল যাত্রা

সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের চেয়ে মঙ্গল গ্রহ নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ একটু বেশি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, এই গ্রহটাই হতে পারে আমাদের ভবিষ্যতের ঠিকানা! আগামীর পৃথিবী তো চিরদিন একরকম সুজলা সুফলা থাকবে না। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে যদি একদিন আমাদের গ্রহটি আর বাসযোগ্য না থাকে, তাহলে কী হবে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, তখন মঙ্গলই হতে পারে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য, আমাদের দ্বিতীয় বাসভূমি। 

সৌরজগতে মঙ্গল আমাদের থেকে খুব বেশি দূরে নয়। পৃথিবী থেকে এর সর্বনিম্ন দূরত্ব ৫৪.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার। মহাজাগতিক স্কেলে বেশ কাছেই বলা যায়। আর ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, মঙ্গলের অনেক বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর সঙ্গে মিলে যায়। এখানে দিনরাতের দৈর্ঘ্য প্রায় পৃথিবীর মতোই। একসময় এখানে নদী, হ্রদ, এমনকি সমুদ্রও ছিল। এখানে পানি জমাট বাঁধা বরফ অবস্থায় পাওয়া গেছে। আমরা জানি, পানির অপর নাম জীবন। তাহলে কি মঙ্গলে একদিন সত্যিই প্রাণের অস্তিত্ব ছিল? আর যদি না থেকে থাকে, তাহলে কি আমরা সেখানে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারি?

এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গত কয়েক দশক ধরে মানুষ একের পর এক মহাকাশযান পাঠাচ্ছে মঙ্গলে। আর প্রতিটা অভিযান আমাদের আরও বেশি অবাক করছে, নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। সেই ১৯৬০-এর দশক থেকেই বিভিন্ন দেশ মঙ্গলে অভিযান চালানোর চেষ্টা করেছে। প্রথমদিকে বেশিরভাগ মিশন ব্যর্থ হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের মার্সনিক ১ ছিল প্রথম চেষ্টা, কিন্তু পথেই সেটা হারিয়ে গেল। এরপর এলো নাসার ম্যারিনার ৪, এই মহাকাশযান প্রথম সফলভাবে মঙ্গলের কাছ থেকে ছবি পাঠাল। তখনকার ছবি দেখে বিজ্ঞানীরা হতাশ, কারণ কোথাও কোন প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিত নেই।

এরপর এলো ভাইকিং যুগ। ১৯৭৫ সালে নাসার ভাইকিং ১ আর ভাইকিং ২ প্রথমবারের মতো মঙ্গলের বুকে নামলো। ভাইকিংরা মঙ্গলের ছবি তুললো, মাটি পরীক্ষা করলো, এমনকি জীবনের চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল না। শুধু দেখা গেল মঙ্গলের ধূলিময় বাতাস আর পাহাড়-পর্বতময় লাল রঙের বিস্তীর্ণ ভূমি।

এরপর মঙ্গলে রোবটিক যান পাঠানোর ধুম পড়ে গেল। ১৯৯৭ সালে পাঠানো হলো ছোট্ট রোভার সোর্জার্নার। ওটা মঙ্গলের মাটিতে ঘুরে বেড়িয়ে প্রমাণ করলো, হ্যাঁ, একসময় এখানে পানি বয়ে গিয়েছিল। এরপর এলো, স্পিরিট আর অপারচুনিটি, একেবারে ভাই-ভাই রোভার। এদেরকে নাকি মাত্র তিন মাস কাজ করার জন্য বানানো হয়েছিল। কিন্তু স্পিরিট কাজ করলো প্রায় ৬ বছর পর্যন্ত, আর অপারচুনিটি টিকে রইলো প্রায় ১৫ বছর! ওরা মঙ্গলে ঘুরে ঘুরে অনেক ছবি তুললো, পাথরের নমুনা পরীক্ষা করলো। ওদের পাঠানো ছবিতে দেখা গেল, মঙ্গল গ্রহ একদমই শুষ্ক মরুভূমি। কিন্তু বহু বছর আগে সেখানে নদী ও ঝরনা বহমান ছিল, সে চিহ্নও পাওয়া গেল।

এরপর ২০১১ সালে উৎক্ষেপণ করা হলো কিউরিওসিটি রোভার, একদম হাই-টেক এক গবেষণাগার। ২০১২ সালের আগস্টে এটি সফলভাবে মঙ্গলের মাটিতে নেমে আসে। কিউরিওসিটি একেবারে প্রমাণ করে দিল, একসময় মঙ্গলে এমন পরিবেশ ছিল যেখানে প্রাণ থাকতে পারতো।

২০১৮ সালে পাঠানো হলো ইনসাইট, যেটা আবার ভূমিকম্প মাপার কাজ করলো। হ্যাঁ, মঙ্গলেও ভূমিকম্প হয়, যাকে বলে "Marsquake"। তার মানে, মঙ্গল গ্রহ এখনো ভূতাত্ত্বিকভাবে সচল রয়েছে। তবে পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম।

তারপর ২০২০ সালে মঙ্গলে পাঠানো হলো অত্যাধুনিক এক রোভার, পারসিভিয়ারেন্স। সাথে হেলিকপ্টার ইঞ্জিনুইটি; যেটা মঙ্গল গ্রহে প্রথমবারের মতো উড়ে দেখালো। এই ছোট্ট হেলিকপ্টার একের পর এক উড়ে প্রমাণ করলো, মঙ্গলের পাতলা বাতাসেও ওড়া সম্ভব। পারসিভিয়ারেন্স এখনো মঙ্গলের মাটিতে চক্কর দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করছে, ভবিষ্যতে এই নমুনা পৃথিবীতে আনা হবে।

শুধু রোভার নয়, বিভিন্ন দেশের মহাকাশযান এখন মঙ্গলের চারপাশের কক্ষপথেও ঘুরছে। নাসার মার্স রিকনেসান্স অরবিটার থেকে শুরু করে, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির মার্স এক্সপ্রেস, সংযুক্ত আরব আমিরাতের হোপ প্রোব, চীনের তিয়ানওয়েন -১, সবাই এখন মঙ্গলের কক্ষপথে গবেষণায় ব্যস্ত। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতীয় মহাকাশ সংস্থার "মঙ্গলযান" সফলভাবে মঙ্গলের কক্ষপথে প্রবেশ করে।  পরিকল্পনা ছিল মঙ্গলযান মাত্র ৬ মাস কাজ করবে, কিন্তু এই মিশন টিকে ছিল ২০২২ সাল পর্যন্ত।

কিন্তু এরপর? এরপর কি হবে? মানুষ কি আদৌ মঙ্গলে যাবে? নাসা আর স্পেসএক্স বলছে, ২০৩০ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যেই মানুষ মঙ্গলে অবতরণ করতে পারে। সেই লক্ষ্য নিয়ে তারা এখন কাজ করে যাচ্ছে। এটা সত্যি হলে তো এটাই হবে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার। 

এখানে মঙ্গলের বুকে পারসিভিয়ারেন্স রোভারের প্রথম তিন মাসের কার্যকলাপের তিন মিনিটের একটি ভিডিও লিংক দিলাম:

https://youtu.be/WNrTttvdIMc?si=eEqmfiJVyNkWjvsy

Comments