অপর সভ্যতার সন্ধানে


মহাবিশ্বে মানব সভ্যতার চেয়ে উন্নত সভ্যতার অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই। প্রচুর কল্পকাহিনী রচিত হয়েছে ভিন্ন গ্রহের প্রাণীদের নিয়ে। সপ্তদশ শতাব্দীতে জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী কেপলার মহাশূন্যে অভিযানের এক গল্প লিখলেন। তাঁর গল্পের অভিযাত্রীরা চাঁদে গিয়ে বিচিত্র সব সরীসৃপের পাল্লায় পড়েছিলো। ওটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। ওই শতাব্দীরই শেষদিকে ডাচ গণিতজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান হাইগেন্স একটি বই লিখলেন অন্য গ্রহে প্রাণের সম্ভবনা নিয়ে।

১৮৯৪ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী পার্সিভাল লয়েল তাঁর টেলিস্কোপ দিয়ে মঙ্গলগ্রহ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে অদ্ভুত এক ব্যাপার লক্ষ্য করলেন। তিনি দেখলেন, মঙ্গলের বুকে আড়াআড়ি কিছু দাগ দেখা যাচ্ছে। তাঁর মনে হলো, এগুলো প্রাকৃতিক দাগ নয়, বরং এগুলো মঙ্গলগ্রহের "অধিবাসীদের" সৃষ্টি করা খাল। তিনি বললেন, এগুলো তারা কৃষিকাজের জন্য তৈরি করেছে। সে সময় পার্সিভালের ধারণাটি ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীতে অবশ্য আরো শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করার ফলে তাঁর ধারণাটি ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়।

পৃথিবী ছাড়াও অন্য কোন গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, এটা অনেক পুরোনো ধারণা। বিংশ শতাব্দীতে এসে এই প্রাচীন ধারণাটি একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি লাভ করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মানুষ এখন নিয়মিতভাবে মহাকাশে নভোযান পাঠাচ্ছে। ‌চাঁদ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছে শিলাখণ্ড। মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়েছে একাধিক রোবোটিক যান। সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহেই মানুষের তৈরি করা নভোযান পৌঁছে গেছে। ‌

চাঁদ এবং মঙ্গলগ্রহে জমাট পানির অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপাতেও বরফের অস্তিত্ব আছে। শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসে জলীয় বাষ্প উৎক্ষিপ্ত হতে দেখা গেছে। পানির অপর নাম জীবন। যেখানে পানি রয়েছে, সেখানে জীবের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া অনেক উল্কাখণ্ডের মধ্যে অ্যামাইনো এসিডের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। প্রোটিনের মূল উপাদান হলো অ্যামাইনো এসিড, যা জীবজগতের জন্য অপরিহার্য।
শক্তিশালী অপটিক্যাল এবং রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আমাদের সৌরজগতের বাইরে এ পর্যন্ত ৫,৫০০-এর বেশি এক্সোপ্ল্যানেট নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকগুলোর আকার পৃথিবীর মতো এবং তাদের নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করছে। এসব গ্রহে সভ্যতার বিকাশ হওয়া একেবারে অসম্ভব নয়।

মানুষ আস্তে আস্তে মহাবিশ্বকে বুঝতে শিখেছে, বুঝতে পেরেছে এর বিশালত্বকে। কিন্তু এত কিছুর পরেও পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা হাল ছাড়ার পাত্র নন। মহাকাশে প্রাণের সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। এটা মূলত দু'ধরনের:
১. চাঁদ অথবা সৌরজগতের অন্য কোন গ্রহে অণুজীবের সন্ধান।
২. সৌরজগতের বাইরে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী ও তাদের সভ্যতার অস্তিত্ব।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্ব এতই বিশাল যে সেখানে উন্নত সভ্যতা থাকাটাই স্বাভাবিক। পৃথিবীতে যে নিয়মে প্রাণের উন্মেষ ঘটেছে, তা অন্যত্রও ঘটতে পারে। জীব বিবর্তনের ধারায় সেখানেও উন্নত সভ্যতার বিকাশ সম্ভব।

১৯৬৪ সালে রাশিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী নিকোলাই কার্ডাশেভ সভ্যতাকে শক্তি ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে তিন ভাগে ভাগ করেন। টাইপ-ওয়ান সভ্যতা তাদের নিকটবর্তী নক্ষত্র থেকে গ্রহে পৌঁছানো শক্তি ব্যবহার করে। টাইপ-টু সভ্যতা সরাসরি তাদের নক্ষত্রের শক্তি আহরণ করতে পারে। টাইপ-থ্রি সভ্যতা তাদের সমগ্র গ্যালাক্সির শক্তি কাজে লাগাতে পারে। পৃথিবীর মানুষ এখনো টাইপ-ওয়ানের নীচে রয়েছে, প্রায় টাইপ ০.৭২ পর্যায়ে। অনুমান করা হচ্ছে, আগামী কয়েক শতাব্দীর পর আমরা হয়তো টাইপ-ওয়ান সভ্যতায় রূপান্তরিত হতে পারব।

ষাটের দশকের শুরুতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ড্রেক "ড্রেক সমীকরণ"-এর মাধ্যমে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে কতগুলো উন্নত সভ্যতা থাকতে পারে তার একটি আনুমানিক হিসাব দেন। এর ফলাফল কয়েক হাজার থেকে কয়েক মিলিয়নের মধ্যে হতে পারে।
এছাড়া, ফ্রাঙ্ক ড্রেক রেডিও টেলিস্কোপ তাক করেছিলেন সূর্যের মতো সাইজের দুটি নক্ষত্রের দিকে, ১৪২০ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে—যা মহাবিশ্বে হাইড্রোজেন গ্যাস থেকে নির্গত হয়। তাঁর ধারণা ছিল, উন্নত সভ্যতা যোগাযোগ করতে চাইলে এই ফ্রিকোয়েন্সিই বেছে নেবে। যদিও তাঁর সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি, তবে এখান থেকেই শুরু হয় SETI (Search for Extraterrestrial Intelligence) প্রকল্প। এর অধীনে বিশাল রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে অন্য সভ্যতার রেডিও সিগন্যাল খোঁজা হয়েছে, যদিও নিশ্চিত কিছুই পাওয়া যায়নি। তবে ১৯৭৭ সালে ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিও টেলিস্কোপে ৭২ সেকেন্ডের এক রহস্যময় রেডিও সিগন্যাল ধরা পড়ে, যা “Wow! Signal” নামে খ্যাত। আজও এর সঠিক ব্যাখ্যা নেই।

২০১৬ সালে উদ্যোক্তা ইউরি মিলনার ১০০ মিলিয়ন ডলারের Breakthrough Listen প্রকল্প শুরু করেন। এর আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে মহাশূন্যে সিগন্যাল অনুসন্ধান চলছে। ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার পার্কস টেলিস্কোপে ৯৮২ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে একবারের জন্য একটি সিগন্যাল ধরা পড়ে, যা প্রক্সিমা সেন্টরাই নক্ষত্রমণ্ডল থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটি পৃথিবীর তৈরি রেডিও সিগন্যাল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। 

তবুও বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। তাঁরা মনে করেন আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই মহাবিশ্বে অপর কোনো সভ্যতার প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। বিশেষত, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের সাহায্যে কিছু সম্ভাব্য বায়োসিগনেচার ও টেকনোসিগনেচার অনুসন্ধান চলছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই এ ব্যাপারে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া যাবে।

মানুষ আদৌ তার আন্তঃনাক্ষত্রিক সাথীকে খুঁজে পাবে কিনা সেটা বলা কঠিন। তবে, একবার এমন সভ্যতার সন্ধান মিললে মানব সভ্যতার জন্য তা হবে এক বিশাল সন্ধিক্ষণ।

খ্যাতিমান জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান বলেছিলেন:
"এত বড় মহাবিশ্ব যদি শুধু আমাদের জন্যই হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে স্পেসের বড়ই অপচয় হয়েছে।"

© তানভীর হোসেন

Comments