প্রসঙ্গ: হাইব্রিড ধান


বাংলাদেশে হাইব্রিড (hybrid) ধানের উৎপাদন ক্রমেই বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে হাইব্রিড ধানের চাষ প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪.০৬ কোটি টন। এর মধ্যে বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২.১০ কোটি টন, আর এই বোরো মৌসুমেই হাইব্রিড ধানের চাষ সবচেয়ে বেশি হয়। ২০২২-২৩ বোরো মৌসুমে প্রায় ১.১৩৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধানের চাষ হয়েছে, যেটা ছিল সারা দেশের মোট বোরো জমির প্রায় ২৪.৯৫%। ২০১৬-১৭ সালে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ০.৬৬ মিলিয়ন হেক্টর বা ১৪%।

ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর এবং খুলনা বিভাগের বারোটি জেলায় বোরো মৌসুমে হাইব্রিড ধানের চাষের হার গড়ের চেয়ে অনেক বেশি,‌ কিছু জেলায় এটি ৫০% ছাড়িয়ে গেছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশে বোরো মৌসুমে হাইব্রিড ধানের চাষাবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও আমনের ক্ষেত্রে হাইব্রিড ধানের চাহিদা এখনো তেমন বাড়েনি। বর্তমানে আউশ, আমন ও বোরো এই তিন মৌসুম মিলিয়ে প্রায় ১২% জমিতে হাইব্রিড ধানের চাষ হচ্ছে, যেটা ২০৩০ সালের মধ্যে ২০%-এ উন্নীত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৫০ সালে এই কভারেজ ৪০%-এ পৌঁছাতে পারে।

কৃষকরা হাইব্রিড ধানের দিকে ঝুঁকছেন, তার মূল কারণ হলো হাইব্রিড ধানের উৎপাদন দেশে বহুল প্রচলিত উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানের চেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গড়পড়তা হিসেবে হাইব্রিড ধান সাধারণ উচ্চ ফলনশীল ধানের চেয়ে প্রায় ১৫% বেশি ফলন দেয়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে এর কিছুটা তারতম্য হতে পারে।

এখানে সবার বোঝার সুবিধার্থে, সাধারণ উচ্চ ফলনশীল ধানের সাথে হাইব্রিড ধানের মূল পার্থক্যটা একটু বিস্তারিত বলি। আমাদের দেশে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে উচ্চ ফলনশীল ধানের চাষ হয়ে আসছে। উদ্ভিদ প্রজননের পরিভাষায়, এসব উচ্চ ফলনশীল ধানের জাতগুলো বলা হয়, ইনব্রেড (Inbred) ভ্যারাইটি। এসব ইনব্রেড জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দুটো ভিন্ন জাতের ধানের বৈশিষ্ট্য ক্রসিংয়ের মাধ্যমে একটি জাতের ধানের মধ্যে আনা হয়। যেমন ধরুন, একটি জাতের ধানে রয়েছে উচ্চ ফলনশীলতা, আর অন্য একটি জাতের ধানে রয়েছে লবণাক্ততা সহিষ্ণুতা। এই দুটো জাতের মধ্যে ক্রসিং করে নতুন একটি লবণাক্ততা সহিষ্ণু উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে, ক্রসিংয়ের পর দ্বিতীয় প্রজন্ম (F2) থেকে গাছ বাছাই শুরু হয়, তারপর কয়েকটি প্রজন্মে বাছাইয়ের পর ধানগাছগুলোকে একটি সুষম ও স্থিত জেনেটিক অবস্থায় আনা হয়। ফলে কৃষকরা এসব ধানের বীজ সহজেই সংরক্ষণ করে পরবর্তী মৌসুমে ব্যবহার করতে পারেন। গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) একশটিরও বেশি উচ্চ ফলনশীল ইনব্রেড ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, এগুলোকে বলা হয়, ব্রি-ধান।
দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় এসব উচ্চ ফলনশীল ব্রি-ধান উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।

অন্যদিকে, হাইব্রিড জাতের ক্ষেত্রে দুটো ভিন্ন জাতের মধ্যে ক্রসিং করে প্রথম প্রজন্মকেই (F1) বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়। তার কারণ হলো, প্রথম প্রজন্ম ফলনে বাবা-মাকে ছাড়িয়ে যায়, একে বলে হাইব্রিড ভিগর। কিন্তু ফলন ভালো পেলেও, কৃষক এই হাইব্রিড ধানের বীজ সংরক্ষণ করে পরবর্তী মৌসুমে ভালো ফসল পান না। কারণ হাইব্রিড বীজ পরবর্তী প্রজন্মে স্থিতিশীল থাকে না। ফলে প্রতিবছর কৃষককে নতুন করে হাইব্রিড বীজ কিনতে হয়। এ কারণেই হাইব্রিড বীজ উৎপাদন ও বিপণনে বাণিজ্যিক কোম্পানির আগ্রহ বেশি।

ধান একটি স্ব-পরাগায়িত উদ্ভিদ হওয়ায় হাইব্রিড বীজ উৎপাদন প্রযুক্তিগতভাবে বেশ জটিল। এর জন্য তিন ধরনের ধানগাছের প্রয়োজন হয়—A লাইন (নপুংসক), B লাইন (মেইনটেইনার) এবং R লাইন (রেস্টোরার)। এই পদ্ধতির উদ্ভাবক চীনের বিজ্ঞানী ইউয়ান লং পিঙ, যাকে ‘হাইব্রিড ধানের জনক’ বলা হয়। বর্তমানে চীন দুই-লাইনের উন্নত হাইব্রিড প্রযুক্তিও ব্যবহৃত হচ্ছে। হাইব্রিড প্রযুক্তির কল্যাণে চীন পৃথিবীর মাত্র ১০% কৃষিজমি ব্যবহার করেও বিশ্বের ২০% 
মানুষের খাদ্য সরবরাহ করছে।
বর্তমান বিশ্বে হাইব্রিড ধানের প্রযুক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে চীন। 

বাংলাদেশে  উৎপাদিত হাইব্রিড ধানের অধিকাংশ বীজই চীন থেকে আসে। যদিও ব্রি কিছু হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন করেছে, বাজারে কিন্তু সেগুলোর প্রতিযোগিতা সীমিত। বর্তমানে দেশে ২৩৫টি হাইব্রিড জাতের চাষ অনুমোদিত, যার মধ্যে মাত্র ২৭টি দেশীয়। তবে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও বগুড়া জেলায় বেসরকারি খাতে হাইব্রিড বীজ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে হাইব্রিড ধান বীজের বাজারমূল্য এখন প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং এর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। 
যদিও কিছু কিছু কোম্পানি দেশে হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করছে, কিন্তু তারা প্রযুক্তিগতভাবে এখনো বিদেশি কোম্পানির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি বীজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি কোম্পানিকে সর্বোচ্চ ছয় বছর আমদানি করার সুযোগ দিয়ে তারপর দেশেই বীজ উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।

সবশেষে, মনে রাখতে হবে, হাইব্রিড ধান মূলত অনুকূল আবহাওয়ার জন্য উদ্ভাবিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ধানচাষের পরিবেশ ক্রমেই প্রতিকূল হচ্ছে, জমিও কমছে। তাই উচ্চ ফলনশীল ইনব্রেড ধানের ফলন আরো বাড়িয়ে হাইব্রিডের সমমানে নিয়ে আসাটাও জরুরি। যদিও এটি কঠিন কাজ তবে অসম্ভব নয়। পৃথিবীর নানা দেশে এনিয়ে এখন গবেষণা চলছে। বাংলাদেশের ধান বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবেন বলে আশা করছি। 

তথ্যসূত্র: 
• Financial Express Bangladesh, “Hybrid rice cultivation doubles in five years”, June 29, 2022.
• The Daily Star, “Hybrid rice planted on record area”, April 2023.
• Bangladesh Observer, “Boro rice production hits all-time high”, June 2024.
• Worldwide Journals (IJSR), “Hybrid Rice Research and Cultivation in Bangladesh: Potentiality and Prospects”, June 2024.
• IRRI-CGIAR News, “Seeing is believing: Farmers evaluate hybrid rice varieties in Bangladesh field days”, May 2025.
• 
• USDA GAIN Report, “Grain and Feed Update – Bangladesh”, 2024.

Comments