কার্ল শোয়ার্জশীল্ড (১৮৭৩ - ১৯১৬)



কার্ল শোয়ার্জশীল্ড ছিলেন একজন জার্মান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। তিনিই প্রথম আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের ফিল্ড সমীকরণ সমাধান করে বস্তুর মহাকর্ষীয় ব্যাসার্ধ বের করেছিলেন। এজন্য বস্তুর মহাকর্ষীয় ব্যাসার্ধকে বলা হয়, শোয়ার্জশীল্ড ব্যাসার্ধ।

কোন বস্তুকে সংকুচিত করে যদি শোয়ার্জশীল্ড ব্যাসার্ধে নিয়ে আসা হয়, তাহলে সেই বস্তুর মহাকর্ষ বল হয়ে উঠবে সর্বগ্রাসী। অন্যভাবে বলা যায়, এটি হলো বস্তুর চূড়ান্ত সহনসীমা বা আল্টিমেট ব্রেকিং পয়েন্ট। এরপর বস্তুটি ধ্বসে পড়ে একটি সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছে যাবে। কোন বস্তু যদি তার শোয়ার্জশীল্ড ব্যাসার্ধে পৌঁছে যায় তাহলে প্রবল মহাকর্ষ বলের কাছে আলোকরশ্মিও বাঁধা পড়ে যাবে। বাইরের দর্শকের কাছে বস্তুটি হয়ে যাবে অদৃশ্য। কোন নক্ষত্র যদি সংকুচিত হয়ে শোয়ার্জশীল্ড ব্যাসার্ধে চলে আসে তাহলে সেটি একটি ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে। 

কোন বস্তুর প্রকৃত ব্যাসার্ধের তুলনায় তার শোয়ার্জশীল্ড ব্যাসার্ধ একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। যেমন ধরুন, সূর্যের প্রকৃত ব্যাসার্ধ ৬৯৬,৩৪০ ‌কিলোমিটার হলেও এর শোয়ার্জশীল্ড ব্যাসার্ধ হলো মাত্র ২.৯৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ সৌর ভর অক্ষুন্ন রেখে সূর্যকে যদি সংকুচিত করে এই ক্ষুদ্র ব্যাসার্ধে নিয়ে আসা হয়, তাহলে সূর্য একটি ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে। পৃথিবীর জন্য এই ব্যাসার্ধটি হলো মাত্র ৮.৯ মিলিমিটার। 

বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জশীল্ড আইনস্টাইনের ফিল্ড সমীকরণ সঠিক সমাধান করে ব্ল্যাকহোলের গাণিতিক ভিত্তিটি দিয়ে গেছেন। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এই কাজটি তিনি করেছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে বসে। ১৯১৫ সালে শোয়ার্জশীল্ড প্রথম মহাযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। ‌ জার্মান সেনাবাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট হিসেবে তিনি রুশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আইনস্টাইন তখন সবেমাত্র তাঁর যুগান্তকারী আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। কার্ল শোয়ার্জশীল্ড যুদ্ধক্ষেত্রে বসেই সেই গবেষণাপত্রটি পড়েছিলেন। ‌তারপর সেখানে বসেই, জটিল অংক কষে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ফিল্ড সমীকরণের সঠিক সমাধান করে ফেললেন। শোয়ার্জশীল্ড আইনস্টাইনকে চিঠি লেখে সেটা জানিয়েছিলেন। আইনস্টাইন তখন তাঁর সমীকরণের সঠিক সমাধান দেখে চমৎকৃত হয়েছিলেন এবং তিনি প্রুশিয়ান বিজ্ঞান একাডেমীর কাছে সেটি তুলে ধরেছিলেন। ‌ 

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, শোয়ার্জশীল্ড যুদ্ধক্ষেত্রে থাকতেই অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৯১৬ সালে, মাত্র ৪২ বছর বয়সে তিনি অকালে লোকান্তরিত হন। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই ক্ষণজন্মা বিজ্ঞানীর নাম অনুসারে একটি গ্রহাণুর নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়াও চন্দ্রপৃষ্ঠের একটি ক্রেটারের নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। কিন্তু জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, মহাকর্ষীয় ব্যাসার্ধ নিয়ে তাঁর ঐতিহাসিক কাজটির জন্য, যার মাধ্যমে ব্ল্যাকহোলের ধারণাটি গাণিতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

Comments