দৃশ্যমান এই বিশাল মহাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে লক্ষ-কোটি গ্যালাক্সি। আর এসব গ্যালাক্সির মাঝে ছড়িয়ে রয়েছে লক্ষ-কোটি নক্ষত্র। কিন্তু তারপরও বলতে হয়, মহাবিশ্ব মূলত ফাঁকা। মহাবিশ্বের বেশিরভাগ এলাকা জুড়েই রয়েছে শূন্যতা, যাকে আমরা সহজ ভাষায় বলি মহাশূন্য। এর মানে হলো, যেখানে কিছুই নেই। কিন্তু আসলেই কি মহাশূন্য একেবারেই শূন্য? নাকি এই অসীম শূন্যতার মাঝে অন্য কিছুর অস্তিত্ব রয়েছে, যেটা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়?
বিশাল মহাবিশ্বে এই প্রশ্নের জবাব খোঁজার আগে, চলুন আমরা পরমাণুর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগতের অভ্যন্তরীণ অবস্থাটি দেখে আসি। হাইড্রোজেন পরমাণুর কথাই ধরুন। এর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসে রয়েছে একটি প্রোটন কণা। একে কেন্দ্র করে চারপাশে ঘুরছে একটি ইলেকট্রন কণা। কিন্তু হাইড্রোজেন পরমাণুর ভেতরে অত্যন্ত সামান্য একটু অংশই দখল করে প্রোটন ও ইলেকট্রন। হাইড্রোজেন পরমাণুর ভেতরের শতকরা ৯৯.৯৯ ভাগ অংশই হলো ফাঁকা। অর্থাৎ পরমাণুর ভেতরটিও মহাশূন্যের মতই শূন্য।
এই শূন্যতাটি কতটা ব্যাপক, সেটি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। আমাদের পৃথিবীতে যত পরমাণু আছে, তার ভেতর থেকে যদি সব ফাঁকা অংশ সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে আমাদের পুরো পৃথিবীর আয়তন চুপসে গিয়ে হবে একটি টেনিস বলের সমান। কিন্তু এর ভরের কোনো পরিবর্তন হবে না। তাহলে ভেবে দেখুন, পরমাণুর ভেতরে শূন্যস্থান না থাকলে বস্তুর অবস্থাটি কেমন হতো।
এই বিশাল মহাবিশ্ব এবং বস্তুর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগৎ—সব জায়গাতেই শূন্যতার ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। অথচ আমরা মনে করি শূন্যতা মানে কিছুই না। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মহাবিশ্বে শূন্যতার গুরুত্ব অপরিসীম। শূন্যতা না থাকলে পরমাণু গঠিত হতে পারত না। পরমাণু না থাকলে বস্তুও গঠিত হতো না। আর বস্তু না থাকলে মহাবিশ্বেরও সৃষ্টি হতো না। সেজন্য অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, শূন্যতা থেকেই মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছে।
ব্যাপারটা গোলমেলে মনে হলেও এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। শূন্যতা থেকে কিভাবে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হতে পারে সেটা বুঝতে হলে আমাদেরকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের শরণাপন্ন হতে হবে। বস্তুর অভ্যন্তরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগতের নিয়ামক হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্স। পরমাণুর ভেতর যে শূন্যতা রয়েছে, তাকে বলা হয় কোয়ান্টাম শূন্যতা। এটি আসলে পুরোপুরি শূন্য নয়। এই শূন্যতার মাঝে লুকিয়ে রয়েছে এক ধরনের শক্তি, যার ফলে এখানে সব সময় এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে। একে বলা হয় কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন। এর ফলে কোয়ান্টাম শূন্যতার মাঝে সর্বদাই ভার্চুয়াল কণা এবং প্রতি-কণার উদ্ভব হয়, আবার মুহূর্তের মধ্যেই তারা মিলিয়ে যায়। আশ্চর্য শোনালেও কোয়ান্টাম জগতে এই ফ্ল্যাকচুয়েশন সবসময়ই ঘটছে। এর স্বপক্ষে পরীক্ষামূলক প্রমাণও রয়েছে।
১৯২৭ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ভার্নার হাইজেনবার্গ গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছিলেন কোনো বস্তুকণার অবস্থান এবং ভরবেগ একই সাথে নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। একে বলা হয় হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্র। আসলে বস্তুকণাদের শুধুমাত্র কণা বললে ভুল হবে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম অনুসারে বস্তুকণা একইসাথে কণা এবং তরঙ্গ—দুই অবস্থায়ই থাকতে পারে। তাই বস্তুকণার গতি-প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে হয় তরঙ্গ-ফাংশনের সাহায্যে।
১৯২৮ সালে ব্রিটিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক তাঁর বিখ্যাত সমীকরণের মাধ্যমে ইলেকট্রনের গতি-প্রকৃতির ব্যাখ্যা দেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, ইলেকট্রনের বিপরীতে প্রতি-ইলেকট্রন কণার অস্তিত্বও থাকা সম্ভব। ১৯৩২ সালে বিজ্ঞানী কার্ল অ্যান্ডারসন সত্যি সত্যিই প্রতি-ইলেকট্রন কণার সন্ধান পান, যার নাম হলো পজিট্রন। এর ভর ইলেকট্রনের সমান হলেও চার্জ বিপরীত, অর্থাৎ পজিটিভ। এরপর প্রোটনের বিপরীতে প্রতি-প্রোটন, নিউট্রনের বিপরীতে প্রতি-নিউট্রন কণারও সন্ধান পাওয়া যায়। এসব প্রতি-কণা দিয়ে তৈরি হয় অ্যান্টিম্যাটার। কিন্তু প্রকৃতিতে আমরা অ্যান্টিম্যাটার দেখি না, কারণ প্রতি-পদার্থ কণা সাধারণ পদার্থ কণার সংস্পর্শে আসলেই বিপুল শক্তি উৎপন্ন করে উভয়ই বিনষ্ট হয়।
তবে কোয়ান্টাম শূন্যতার ভেতরে ভার্চুয়াল কণা ও প্রতি-কণার জন্ম-মৃত্যু প্রতিনিয়তই ঘটছে। এটাই হলো কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশনের মূল কথা। এই কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশনের উপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের উৎপত্তির একটি ধারণা দিয়েছেন। আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল। বিগ ব্যাংয়ের আগে কি ছিল সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের বক্তব্য হলো, এর আগে কিছুই ছিল না। বিগ ব্যাংয়ের ফলেই স্থান ও কালের সৃষ্টি হয়েছে। সময়ই যেহেতু বিগ ব্যাংয়ের ফলে জন্ম নিয়েছে, সেহেতু “বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল” প্রশ্নটি আসলে অর্থহীন।
কিন্তু বিগ ব্যাং কেন হয়েছিল, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, সৃষ্টির সূচনায় মহাবিশ্বের সমস্ত শক্তি একটি ক্ষুদ্র বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত ছিল। এই বিন্দুর ভেতরে কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশনের কারণে আকস্মিক পরিবর্তন হয় এবং সেখান থেকেই ঘটে বিগ ব্যাং।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিস্ফোরণের পর মুহূর্তেই মহাবিশ্ব দ্রুত স্ফীত (inflation) হয়। হিসাব অনুযায়ী, বিগ ব্যাং ঘটার 10^-37 থেকে 10^-35 সেকেন্ডের মধ্যে মহাবিশ্বের আয়তন জ্যামিতিক হারে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এরপর মহাবিশ্বে বস্তুকণার উদ্ভব হয়, ধীরে ধীরে গঠিত হয় হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম পরমাণু। সেগুলো পুঞ্জিভূত হয়ে তৈরি হয় নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি, যা আজ দৃশ্যমান মহাবিশ্বের অংশ।
বিগ ব্যাং থেকে সৃষ্ট মহাবিশ্ব এখনো ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। আর আধুনিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গ্যালাক্সিগুলো কেবল দূরে সরে যাচ্ছে না, বরং সরে যাওয়ার গতি বাড়ছে। এর পেছনে কাজ করছে এক রহস্যময় অদৃশ্য শক্তি, যার নাম ডার্ক এনার্জি। মনে হচ্ছে কোনো অজানা শক্তি গ্যালাক্সিগুলোকে ক্রমাগত দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা হিসেব করেছেন, মহাবিশ্বের মোট শক্তির প্রায় ৬৮ শতাংশই ডার্ক এনার্জি। তবে এর উৎস এখনো অজানা। কেউ মনে করেন, এটি মহাশূন্যের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য, আবার কেউ মনে করেন এটাও কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশনের ফল। যদিও এ ধারণার পক্ষে সরাসরি কোনো পরীক্ষামূলক প্রমাণ নেই।
তবে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, মহাবিশ্বের শূন্যতা আসলে পুরোপুরি শূন্য নয়। এর ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে শক্তি, অস্থিরতা এবং সৃষ্টির বীজ। অসীম শূন্যতার মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে মহাবিশ্বের আসল রহস্য।
Comments