২০১৫ সালের ১৪ জুলাই, নাসার নিউ হরাইজন্স (New Horizons) মহাকাশযান এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। প্রথমবারের মত প্লুটোর অদ্ভুত ও অজানা জগতের কাছাকাছি পৌঁছে তার বিস্ময়কর ছবি পৃথিবীতে পাঠিয়েছিল। এর আগে অন্য কোন মহাকাশযান প্লুটোর কাছাকাছি পৌঁছতে পারেনি।
মিশনটি তখন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর অনেকে ভেবেছিল, এর কাজ বুঝি শেষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই মুহূর্ত থেকেই নিউ হরাইজন্স হয়ে উঠেছে সৌরজগতের সীমান্ত পেরিয়ে আরও দূরবর্তী জগতে অভিযাত্রার এক আশ্চর্য বার্তাবাহক।
বর্তমানে নিউ হরাইজন্স সৌরজগতের বাইরের অঞ্চল, অর্থাৎ কাইপার বেল্ট অতিক্রম করে হেলিওস্ফিয়ারের সীমানার দিকে এগিয়ে চলেছে। ২০২৫ সালের মধ্যে এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৫ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট (AU) দূরে থাকবে, যার মানে দাঁড়ায় প্রায় ৯৭০ কোটি কিলোমিটার। এই অবস্থান থেকে নিউ হরাইজন্স মহাকাশের নক্ষত্রগুলোকে কিছুটা ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে দেখছে। এটা পৃথিবী থেকে দেখার চেয়ে আলাদা। এই পার্থক্যকে বলে "স্টেলার প্যারাল্যাক্স"। এটি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা তৈরি করছেন তারকা মণ্ডলির একটি 3D মানচিত্র। ভবিষ্যতের ইন্টারস্টেলার ন্যাভিগেশনের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, নিউ হরাইজন্স কি প্রক্সিমা সেন্টরির দিকে রওনা দিতে পারে? প্রক্সিমা সেন্টরি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র, যেটা ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। একে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে একটি সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহ, যার নাম, প্রক্সিমা বি। এই গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে একটু বড় এবং সবসময় প্রক্সিমা সেন্টরির দিকে মুখ করে থাকে। তাই যদি সেখানে প্রাণের কোনো সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেটা হতে পারে সেই সন্ধিক্ষণ অঞ্চলে, যেখানে আলো ও অন্ধকারের মাঝে অনবরত ঠান্ডা-গরমের দ্বন্দ্ব চলছে।
তবে এই যাত্রা সহজ নয়। নিউ হরাইজন্সের গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৪ কিলোমিটার। এই গতি পৃথিবীতে খুব দ্রুত মনে হলেও মহাবিশ্বের দূরত্বে সেটা অপর্যাপ্ত। এই গতিতে প্রক্সিমা সেন্টরিতে পৌঁছাতে প্রায় ৭৩ হাজার বছর লেগে যাবে। তাই বাস্তবিক অর্থে নিউ হরাইজন্সের মাধ্যমে প্রক্সিমাতে পৌঁছানো এক অসম্ভব প্রস্তাবনা। এর কারণ হলো, বর্তমান যুগের মহাকাশযানের সীমিত গতি।
এই সীমাবদ্ধতা পেরোতে বিজ্ঞানীরা ভাবছেন ভবিষ্যতের নতুন প্রযুক্তির কথা, যেমন লেজার-চালিত লাইটসেল (light sail), নিউক্লিয়ার ফিউশন ড্রাইভ বা এমনকি অ্যান্টিম্যাটার রকেট।
"ব্রেক থ্রু স্টার শট" নামে একটি উচ্চাভিলাসী প্রকল্প ইতোমধ্যেই প্রস্তাব করেছে, ১ গ্রাম ওজনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রোবকে লেজারের সাহায্যে আলোর গতির প্রায় ২০ শতাংশে ঠেলে দেওয়া যেতে পারে। এই গতি থাকলে, প্রক্সিমাতে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ২০ বছর। তবে এখানেও বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যেমন এত দূর থেকে সংকেত পাঠানো, প্রোবকে স্থিতিশীল রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি রেডিয়েশন থেকে রক্ষা করা।
নিউ হরাইজন্স অবশ্য এইসব প্রযুক্তি নিয়ে নয়, বরং তার নিজস্ব শক্তি নিয়ে এখনো এগিয়ে যাচ্ছে। নিউ হরাইজন্স তার অনবোর্ড পার্টিকল ডিটেক্টর, প্লাজমা সেন্সর ও ডাস্ট কাউন্টার দিয়ে দেখছে সৌর বাতাস কিভাবে সৌরজগৎ ছাড়িয়ে মহাশূন্যে মিশে যাচ্ছে। এর প্রতিটি ডেটা একদিন বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে এমন ইন্টারস্টেলার মহাকাশযান তৈরি করতে, যেগুলো আমাদের দুর নক্ষত্রলোকে পৌঁছে দেবে।
তাই নিউ হরাইজন্সের এই যাত্রা কেবল একটি মহাকাশযানের গল্প নয়। এটি বিজ্ঞানের এক অজানা অভিযানের শুরু। প্রক্সিমা সেন্টরির পথে এখন না হলেও, একদিন নিউ হরাইজন্সের উত্তরসূরি হয়তো যাত্রা করবে সেই পথে। আর সেই স্বপ্নই আজ বিজ্ঞানের শক্তি।
ছবি কৃতজ্ঞতা: নিউ সায়েন্টিস্ট।
Comments