মলিক্যুলার বায়োলজিস্টদের কাছে পিসিআর (PCR) বা পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন একটি অতি পরিচিত নাম। এটি হলো ডিএনএ অণুকে বহুগুণে বর্ধিত করার একটি সহজ পদ্ধতি। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মলিক্যুলার বায়োলজির বিভিন্ন পরীক্ষায় পিসিআর বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক যুগে পিসিআর ছাড়া কোনো ডিএনএ ল্যাব কল্পনা করা যায় না। ডিএনএ নিয়ে গবেষণার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে এই প্রযুক্তি।
পিসিআর পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেছিলেন ক্যারি মালিস (Kary Mullis) নামে একজন বায়োকেমিস্ট। প্রথাগত অর্থে তিনি কোনো খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ছিলেন না। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন কিছুটা বাউন্ডুলে স্বভাবের। চাকরি করতেন ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বায়োটেক কোম্পানিতে ডিএনএ কেমিস্ট হিসেবে। তাঁর কাজ ছিল বিভিন্ন অণুজীব থেকে ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করা এবং সেগুলো পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা। কাজটা ছিল সময়সাপেক্ষ এবং একঘেয়ে। ক্যারি ভেবেছিলেন, কিভাবে কাজটা সহজ করা যায়। এই চিন্তাভাবনা করতে গিয়েই হঠাৎ করেই তাঁর মাথায় আসে পিসিআরের ধারণা।
সময়টা ছিল ১৯৮৩ সাল। ছুটিতে বান্ধবীর সঙ্গে ভ্রমণে ছিলেন তিনি। একদিন হাইওয়েতে গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ মাথায় আসে আইডিয়াটি। বিজ্ঞানীরা একে বলেন, “ইউরেকা মোমেন্ট”। গাড়ি থামিয়ে বান্ধবীকে তিনি বলেছিলেন, “ডিএনএ নিয়ে আমি একটি বড় সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি।”
ডিএনএ হলো জীবজগতের বংশগতির ধারক ও বাহক। এর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি নিজের মতো হুবহু আরেকটি ডিএনএ তৈরি করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয়, ডিএনএ রেপ্লিকেশন। প্রকৃতিতে এটি ঘটে কয়েকটি এনজাইমের সাহায্যে, ধাপে ধাপে। ল্যাবে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা ছিল ব্যয়সাপেক্ষ ও জটিল ব্যাপার।
ক্যারি চিন্তা করে দেখলেন, হেলিকেজ (helicase) এনজাইম ছাড়াই কেবল তাপমাত্রা বাড়িয়েই রেপ্লিকেশনের প্রাথমিক ধাপটি শুরু করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা ছিল, ওই তাপমাত্রায় রেপ্লিকেশনের মূল এনজাইম ডিএনএ পলিমারেজ নষ্ট হয়ে যায়। ক্যারি সমাধান খুঁজে পেলেন ট্যাক পলিমারেজ (Taq polymerase) নামের এক বিশেষ এনজাইমে। এই এনজাইম উচ্চ তাপমাত্রায়ও নষ্ট হয় না, বরং স্বাভাবিক ডিএনএ পলিমারেজের মতোই কাজ করে। এর উৎস হলো উষ্ণ প্রস্রবণের ব্যাকটেরিয়া Thermus aquaticus বা সংক্ষেপে Taq।
ক্যারি টেস্টটিউবে টার্গেট ডিএনএ, প্রাইমার, নিউক্লিওটাইড ও ট্যাক পলিমারেজ একসাথে মিশিয়ে নিলেন। তারপর টিউবের তাপমাত্রা একবার বাড়িয়ে, আবার কমিয়ে, আবার বাড়ালেন। এভাবে কয়েকবার করার পর তিনি দেখলেন, টার্গেট ডিএনএ দ্রুত বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ সময় লেগেছে খুবই কম। তিনি এই প্রক্রিয়াটির নাম দিলেন, পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন বা পিসিআর।
তাঁর এই আবিষ্কারটি পেটেন্ট করা হলো। তবে চুক্তি অনুযায়ী পেটেন্ট হয়েছিল তাঁর কোম্পানির নামে, নিজের নামে নয়। আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি মাত্র দশ হাজার ডলার বোনাস পান। কিছুদিন পর তাঁর কোম্পানি পেটেন্টটি বিক্রি করে দেয় অন্য এক প্রতিষ্ঠানের কাছে, ৩০০ মিলিয়ন ডলারে! কিন্তু তার কোনো কানাকড়িও ক্যারি পাননি। এতে তিনি ভীষণ হতাশ হয়েছিলেন।
তবে নোবেল কমিটি তাকে হতাশ করেনি। ১৯৯৩ সালে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু নোবেলের স্বর্ণপদক কিংবা অর্থ পুরস্কারের চেয়েও বড় অর্জন ছিল অন্য জায়গায়। তাঁর এক ঝলক চিন্তার মুহূর্ত থেকেই জন্ম নেওয়া পিসিআর আজ আধুনিক জীববিজ্ঞানের প্রাণশক্তি।
পিসিআর এক আশ্চর্য প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি অতি অল্প পরিমাণ ডিএনএ থেকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই লক্ষ লক্ষ কপি ডিএনএ তৈরি করে ফেলতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় ডিএনএ যেন এক জাদুকরী কপিয়ার মেশিনে ঢুকে ক্রমে ক্রমে নিজের প্রতিলিপি বানায়। প্রথমে ডিএনএকে উত্তপ্ত করা হয় প্রায় ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়, যাতে এর দুটি স্ট্র্যান্ড আলাদা হয়ে যায়। এরপর তাপমাত্রা ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে কমানো হলে ছোট ছোট ডিএনএর টুকরো, যাদের বলা হয় প্রাইমার, এসে মূল ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশে জুড়ে বসে। এই প্রাইমারই নির্দেশ দেয় নতুন ডিএনএ কোথা থেকে তৈরি হবে। তারপর তাপমাত্রা আবার বাড়িয়ে প্রায় ৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ট্যাক পলিমারেজ এনজাইম কাজ শুরু করে। এটি পুরনো ডিএনএর প্রতিটি স্ট্র্যান্ডের বিপরীতে নতুন নিউক্লিওটাইড বসিয়ে নতুন আরেকটি স্ট্র্যান্ড তৈরি করে। এভাবে একটি চক্র শেষে ডিএনএর পরিমাণ দ্বিগুণ হয়। পরপর বহু চক্র চলতে থাকে, আর প্রতিটি চক্রে ডিএনএ গুণিতক হারে বেড়ে যায়। কয়েক ডজন চক্রের পর ক্ষুদ্র একটি অংশ থেকেই তৈরি হয় অসংখ্য কপি - যেটা গবেষণা বা পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট। এভাবেই পিসিআর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ডিএনএ অণুকে অগণিত কপিতে রূপান্তরিত করে বিজ্ঞানীদের হাতে তুলে দেয় বিশ্লেষণের জন্য।
জেনেটিক গবেষণা, চিকিৎসা বিজ্ঞান, ক্যানসার নির্ণয়, ফরেনসিক তদন্ত, এমনকি সাম্প্রতিক মহামারীর সময় করোনা পরীক্ষাতেও পিসিআর হয়ে উঠেছে জীবনরক্ষার অস্ত্র। পৃথিবীর অসংখ্য ল্যাবে ডিএনএ গবেষণায় প্রতিদিন এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই বলা যায়, ক্যারি মালিস হয়তো পেটেন্ট থেকে কোটি ডলার পাননি, কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে - পিসিআরের আবিষ্কর্তা হিসেবে।
© তানভীর হোসেন
Comments