দুইশো মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী ছিল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। তখন জুরাসিক যুগ, ভূমিজুড়ে বিস্তৃত ছিল বিশাল বিশাল কনিফার বন। এই বনেই ঘুরে বেড়াতো ডাইনোসররা। কিন্তু কালের বিবর্তনে ডাইনোসর যেমন হারিয়ে গেছে, তেমনি বিলুপ্ত হয়েছে সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের অসংখ্য কনিফার প্রজাতিও। আমরা তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাই শুধু জীবাশ্মে। বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই ধরে নিয়েছিলেন, এসব প্রজাতি বহু আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে; কখনোই আর দেখা যাবে না তাদের জীবন্ত রূপ।
কিন্তু ১৯৯৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ইতিহাস যেন নতুন মোড় নিল। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের গভীর এবং দুর্গম ওলেমাই ন্যাশনাল পার্কের এক অজানা ক্যানিয়নে প্রবেশ করে কিছু প্রকৃতিপ্রেমী অভিযাত্রী দেখতে পেলেন এক অদ্ভুত গাছ, যা তারা আগে কখনও দেখেননি। নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হলো বিশেষজ্ঞদের কাছে। বিশ্লেষণ শেষে সবাই হতবাক; এটি কোনো নতুন প্রজাতি নয়, বরং জুরাসিক যুগের এক প্রাচীন কনিফার, যাকে দীর্ঘদিন ধরে বিলুপ্ত বলে মনে করা হয়েছিল। যেন দুইশ মিলিয়ন বছর আগের ইতিহাস হঠাৎ জেগে উঠেছে আজকের পৃথিবীতে।
এই বিস্ময়কর আবিষ্কারের পর গাছটির অবস্থান গোপন রাখা হয়, যাতে কোনো অবৈধ সংগ্রাহক বা বাণিজ্যিক স্বার্থে কেউ ক্ষতি করতে না পারে। পরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে, বিশেষ করে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে এর চারা উৎপাদন শুরু হয়। আজ অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বোটানিক্যাল গার্ডেনে এই গাছ যত্নে লালন চলছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও দেখতে পারে পৃথিবীর এই জীবন্ত ফসিলকে।
আমরাও কৃষিবিদ ৮২ ব্যাচের রিইউনিয়নের দ্বিতীয় দিনে ব্লু মাউন্টেন বোটানিক্যাল গার্ডেনে গিয়ে দেখলাম সেই বিস্ময়ের গাছ—ওলেমাই পাইন। বৈজ্ঞানিক নাম Wollemia nobilis। যদিও নামের শেষে “পাইন” শব্দটি আছে, এটি প্রকৃত অর্থে পাইন গাছ নয়; বরং এক আদিম যুগের কনিফার, যার সঙ্গে বর্তমান কোনো প্রজাতির সরাসরি মিল নেই। এর পাতার গঠন, গুঁড়ির রঙ, আর শাখার বিন্যাসে এখনো টিকে আছে লক্ষ লক্ষ বছর আগের পৃথিবীর ছাপ। যেন সময়ের স্রোত পেরিয়ে এই গাছ আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি কখনো পুরোপুরি ভুলে যায় না তার অতীতকে।
© তানভীর হোসেন
Comments