AGI বা “Artificial General Intelligence” শুনতে যতটা খটমটে, ধারণাটা আসলে ততটাই চমকপ্রদ। আজ আমরা যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে জানি, যা ছবি আঁকতে পারে, ভাষা অনুবাদ করতে পারে, বা দাবায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারাতে পারে, সেটা আসলে “ন্যারো এআই” বা সীমিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই এআই নির্দিষ্ট একটি কাজের জন্য তৈরি, এবং তার জ্ঞান বা ক্ষমতা সেই কাজের সীমার ভেতরেই আটকে থাকে। কিন্তু AGI একেবারে অন্য লেভেলের জিনিস। এটা এমন এক ধরণের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যেটা মানুষের মতোই সবকিছু বুঝতে, শিখতে এবং উপলব্ধি করতে পারবে। বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন, কোন কিছুই বাদ যাবে না।
অদূর ভবিষ্যতে এমন এক এআই তৈরি হবে, যার শেখার ক্ষমতা হবে মানুষের মতোই সার্বজনীন। যেভাবে মানুষ একদিকে গিটার বাজাতে শেখে, আবার অন্যদিকে গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে পারে, তেমনি AGI-ও এক কাজ থেকে আরেক কাজ শিখে নতুন পরিস্থিতিতে তা প্রয়োগ করতে পারবে। আজকের ChatGPT বা অন্যান্য AI মডেল অনেক উন্নত হলেও, তারা এখনো নির্দিষ্ট নির্দেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আপনি যদি বলেন, “একটা কবিতা লিখো,” সে লিখবে; কিন্তু নিজে থেকে কখনো কবিতা লিখতে বসবে না। কিন্তু AGI সেই সীমা ভেঙে দিবে।
AGI আসলে এক ধরনের "মানব চেতনা অনুকরণ” করার চেষ্টা। অর্থাৎ এটি কেবল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ নয়, বরং বোঝার, শেখার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখবে। একজন মানুষ যদি দেখে কোথাও আগুন লেগেছে, সে নিজেই বুঝে নেবে কীভাবে নিরাপদে সরে যেতে হবে, এর জন্য সে কারো নির্দেশের অপেক্ষা করবে না। ঠিক তেমনি AGI পরিবেশ ও পরিস্থিতি বুঝে নিজে থেকে যুক্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এই "আত্ম-সচেতনতাই" তাকে অন্যান্য AI থেকে আলাদা করবে।
তবে এই সম্ভাবনা যতটা উজ্জ্বল, ততটাই ভয়ও লুকিয়ে আছে এর ভেতরে। কারণ, একবার যদি কোনো মেশিন মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হয়ে যায়, তখন সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা সম্ভব হবে, তা আজও কেউ জানে না। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং থেকে শুরু করে এলন মাস্ক, অনেকেই সতর্ক করেছেন, “AGI হতে পারে মানবসভ্যতার শেষ উদ্ভাবন।” AGI একবার আত্মসচেতন হয়ে গেলে, নিজেই নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারবে। আর সেই লক্ষ্য যদি মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তবে তা ভয়ানক হতে পারে।
তবুও মানুষ থেমে নেই। গুগল, ওপেনএআই, মাইক্রোসফট, অ্যানথ্রপিক- সব বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানই AGI-র পথে ছুটছে। কেউ বলছে, এই প্রযুক্তি মানুষকে দেবে অমরত্বের চাবি; আবার কেউ মনে করে, এটি হবে মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় বিপদ। AGI সফল হলে, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইন-আদালত, শিল্প সাহিত্য - সব ক্ষেত্রেই মানুষের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারবে। তখন মানুষের কাজের ধরণ, শিক্ষাব্যবস্থা এমনকি সভ্যতার পুরো কাঠামোই বদলে যেতে পারে।
এই প্রশ্নটা এখন সবাইকে ভাবাচ্ছে- কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা AGI আসতে আর কতদিন লাগবে? বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে এ নিয়ে নানা মতভেদ আছে। কেউ মনে করেন, আগামী দশ থেকে পনেরো বছরের মধ্যেই আমরা এর প্রথম রূপ দেখতে পাবো; আবার অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, এখনো অন্তত কয়েক দশক বাকি। সাম্প্রতিক গবেষণা ও জরিপ অনুযায়ী, সবচেয়ে বাস্তবসম্মত অনুমান হলো ২০৪০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে মানবসম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মেশিনের আবির্ভাব ঘটতে পারে। তবে এটাও সত্য, এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো এখনো অনেকটাই অনুমান নির্ভর। কারণ AGI কেবল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নয়, এটি নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নের সাথেও গভীরভাবে জড়িত। হয়তো একদিন সত্যিই কোনো মেশিন মানুষের মতোই চিন্তা করবে আর স্বপ্ন দেখবে। কিন্তু ঠিক কবে সেই দিন আসবে, তা এখনো অজানা ভবিষ্যতের হাতে।
তবে এত সব সম্ভাবনা আর আশঙ্কার মাঝেও একটা বিষয় স্পষ্ট, সেটা হলো AGI মানব মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং তারই এক নতুন উদ্ভাবনী রূপ। মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা, আর কৌতূহলই এই যাত্রার মূল চালিকা শক্তি। তাই AGI যতই শক্তিশালী হোক না কেন, এর জন্ম হবে মানুষের হাতেই। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা প্রযুক্তির নয়, বরং নৈতিকতার। আমরা এই নতুন বুদ্ধিমত্তাকে কীভাবে ব্যবহার করব, সেটাই নির্ধারণ করবে আমাদের ভবিষ্যৎ।
© তানভীর হোসেন
Comments