প্রকৃতির গোপন ছন্দ: ফিবোনাচি সিরিজ আর সোনালী অনুপাত

১৩শ শতকে ইতালীয় গণিতবিদ লিওনার্দো অব পিসা, যিনি “ফিবোনাচি” নামে বেশি পরিচিত ছিলেন, এক সরল যোগফলের ধারাকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। সেই ধারাটিই আজ সারা বিশ্বজুড়ে পরিচিত ফিবোনাচি সিরিজ নামে।

এই সিরিজের শুরুটা যতটা সাধারণ, এর ভেতরের রহস্য ততটাই বিস্ময়কর।  আপনি শূন্য আর এক দিয়ে এই সিরিজ শুরু করলেন। এবার প্রতিবার আগের দু’টো সংখ্যা যোগ করলে এই সিরিজের পরবর্তী নতুন সংখ্যা পাওয়া যাবে। তাই ফিবোনাচি সিরিজের রূপ দাঁড়ায়—০, ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯, ১৪৪ ....। প্রথম দেখায় মনে হবে এ যেন শুধু সংখ্যা নিয়ে খেলা, কিন্তু এই খেলার ভেতরেই লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর এক সূত্র।

এই সিরিজের একটি সংখ্যা দিয়ে তার পরের সংখ্যাকে ভাগ করেন, তখন একটি অদ্ভুত অনুপাত পেতে শুরু করবেন। এর শুরুটা হয় এভাবে, যেমন ৫ ভাগ ৩ দিলে হয় ১.৬৬, ৮ ভাগ ৫ দিলে হয় ১.৬, ১৩ ভাগ ৮ দিলে হয় প্রায় ১.৬২৫। এভাবে যতই সামনের দিকে যাবেন, এই ভগ্নাংশ একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার দিকে গিয়ে স্থির হবে, আর সেই সংখ্যাটি হল, ১.৬১৮ (প্রায়)।  এই অনুপাতকে বলা হয় গোল্ডেন রেশিও বা সোনালী অনুপাত। গ্রীক অক্ষর ফাই (φ) দিয়ে একে বোঝানো হয়। 

প্রকৃতি যেন নিজের অজান্তেই এই সংখ্যাটিকে বারবার ব্যবহার করে তার বিভিন্ন নকশা সাজিয়েছে। যেমন ধরুন, সূর্যমুখীর ফুলের বীজগুলো সর্পিল আকারে সাজানো থাকে, যেখানে প্রতিটি পাকের সংখ্যা হয় ফিবোনাচি ধারার মতো—৩৪ আর ৫৫, অথবা ৮৯ আর ১৪৪। এই বিন্যাসের ফলে সূর্যমুখীর বীজগুলো একে অপরের সাথে ঠেসে না গিয়ে সবচেয়ে বেশি জায়গা পায়। একইভাবে পাইনকোনের আঁশ, আনারসের চোখ কিংবা শামুকের খোলের ঘূর্ণিতেও দেখা যায় গোল্ডেন রেশিওর ছাপ। অনেক গাছের পাতার বিন্যাসও এই সূত্র মেনে চলে, যাতে প্রতিটি পাতা সমানভাবে আলো আর বাতাস পেতে পারে।

অনেকে মনে করেন মানুষের শরীরেও এই সোনালী অনুপাতের ছাপ রয়েছে। মুখমণ্ডলের চোখ, নাক আর ঠোঁটের অবস্থান, অথবা হাত-পায়ের দৈর্ঘ্যের অনুপাত অনেক ক্ষেত্রেই গোল্ডেন রেশিওর সাথে মিলে যায়। প্লাস্টিক সার্জারি ও নান্দনিক বিদ্যায় এই অনুপাতকে সৌন্দর্যের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সব মানুষের ক্ষেত্রে এটি সমানভাবে প্রযোজ্য নয় এবং অনেক গবেষক মনে করেন এসব মিল অনেকাংশে আমাদের নিজস্ব ব্যাখ্যার ফল। তবুও সৌন্দর্যের এক প্রাকৃতিক ছন্দ হিসেবে গোল্ডেন রেশিওকে মানবদেহের সাথে তুলনা করা হয়ে আসছে বহু যুগ ধরে।

শিল্প ও স্থাপত্যেও এর ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। অনেকে বলেন, প্রাচীন গ্রিক পার্থেনন মন্দিরের নকশার অনুপাতে গোল্ডেন রেশিও লুকিয়ে আছে, যদিও নির্মাতারা সচেতনভাবে এটি ব্যবহার করেছিলেন কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একইভাবে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত ভিট্রুভিয়ান ম্যান অঙ্কনেও মানবদেহের অনুপাতে সোনালী অনুপাত প্রতিফলিত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, জীবনের মূল অণু ডিএনএ-তেও এই অনুপাতের ছাপ পাওয়া যায়। ডিএনএর ডাবল হিলিক্স গঠন এক ধরনের প্যাঁচানো সিঁড়ির মতো, যেখানে এক পাক ঘুরতে লাগে ৩৪ অ্যাংস্ট্রম দৈর্ঘ্য এবং এর প্রস্থ হচ্ছে প্রায় ২১ অ্যাংস্ট্রম। অ্যাংস্ট্রম একটি দৈর্ঘ্যের একক, এটা এক মিটারের দশ-বিলিয়ন ভাগের এক ভাগকে বোঝায়। এখানে ২১ আর ৩৪ ফিবোনাচি সিরিজের দুটো ধারাবাহিক সংখ্যা। আর এই ৩৪ ভাগ ২১ করলে যে ভগ্নাংশ পাওয়া যায় তা হলো প্রায় ১.৬১৯ অর্থাৎ সোনালী অনুপাতের খুবই কাছাকাছি। এর মানে, জীবনের ব্লুপ্রিন্টের ভেতরেও প্রকৃতি একই বিস্ময়কর ছন্দে সাজিয়ে রেখেছে তার নকশা।

প্রকৃতি এই গোল্ডেন রেশিও অনুসরণ করে আসছে সেই আদিকাল থেকে। মহাশূন্যের স্পাইরাল গ্যালাক্সির বাহুর ঘূর্ণনেও এই অনুপাত ধরা পড়ে। আসলে গোল্ডেন রেশিওর ভিজ্যুয়াল প্রকাশ হলো, গোল্ডেন স্পাইরাল, যেখানে প্রতিটি পাক আগের পাকের φ (১.৬১৮...) গুণ বড় হয় এবং এর বিশেষ কোণ হয় প্রায় ১৭° ডিগ্রি। আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাহুগুলোর গড় পিচ অ্যাঙ্গেলও প্রায় ১৭°–১৮°, যেটা প্রায় গোল্ডেন স্পাইরালের সাথে মিলে যায়। একইভাবে বিখ্যাত হুইরপুল গ্যালাক্সি (এম৫১) এর সর্পিল বাহু প্রায় নিখুঁত গোল্ডেন স্পাইরালের মতো, যেন মহাবিশ্ব নিজেই সংখ্যার ভাষায় তার বিভিন্ন কাঠামো এঁকে রেখেছে।

তাই ফিবোনাচি সিরিজ আর গোল্ডেন রেশিওকে কেবল গণিতের কৌতূহল বা সৌন্দর্যের মানদণ্ড বললে ভুল হবে। এটা আসলে প্রকৃতির এক নীরব ছন্দ, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা সবাই একই সূত্রে গাঁথা; একই মহাজাগতিক সুরের অংশ, যেখানে সংখ্যা, ছন্দ আর জীবন সব মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

© তানভীর হোসেন

Comments