আমাদের চোখের সামনে যে চেনা পৃথিবী, সেটা এক সরল বাস্তবতার জগত। কিন্তু এই পারিপার্শ্বিক জগতের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগত, আর সেটা হলো, কোয়ান্টামের রাজ্য। এই রাজ্যের নিয়মগুলো ভিন্ন। এখানে ঘটনারা ঘটে আমাদের বোধের বাইরে। এখানে কণারা একই সঙ্গে কণা আবার তরঙ্গ; একই সঙ্গে তারা এখানে থাকে, ওখানে থাকে, আবার সবখানেও থাকতে পারে। আর এই অদ্ভুত জগতের সবচেয়ে বিস্ময়কর রহস্যের নাম, কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট। আইনস্টাইন ঠাট্টা করে একে বলেছিলেন, “স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট এ ডিস্ট্যান্স”, অর্থাৎ দূর থেকে ভৌতিক কান্ড।
কোয়ান্টাম জগতে দুইটি কণা যেন অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা দুই যমজ বোন। একজনের গায়ে আঘাত লাগলেই অন্যজন কেঁপে ওঠে, তারা যত দূরেই থাকুক না কেন। এক প্রান্ত পৃথিবীতে, আরেক প্রান্তে মহাবিশ্বের অন্য সীমানায়; তবুও তাদের মধ্যে যোগাযোগ ভাঙে না। এ যেন প্রকৃতির এক মায়াময় মঞ্চ, যেখানে নিয়মগুলো অদ্ভুত, কিন্তু তবুও অব্যর্থভাবে কাজ করে।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, এই কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট কেবলমাত্র কিছু সীমিত পরিস্থিতিতে, যেমন একমাত্রিক বা দ্বিমাত্রিক জগতে, স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। কিন্তু সম্প্রতি এক অভাবনীয় আবিষ্কার জানিয়ে দিল, ডাইমেনশন বাড়লেও এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট আসলে সর্বত্রই একই সর্বজনীন নিয়ম মেনে চলে।
এই রহস্য উন্মোচনে ব্যবহার করা হয়েছে, থার্মাল ইফেক্টিভ থিওরি। এই তত্ত্ব কণা পদার্থবিজ্ঞানের এক বিশেষ হাতিয়ার। যেটা দিয়ে ক্ষুদ্র কণাদের আচরণ বোঝা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, সেই একই তত্ত্ব দিয়ে এবার ব্যাখ্যা করা গেল এন্ট্যাঙ্গলমেন্টের জটিল নকশা। ফলে প্রমাণিত হলো, কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্টের গভীরতম রহস্যের ভেতরেও লুকিয়ে আছে এক সুশৃঙ্খল ছন্দ, যেটা কিনা সব ডাইমেনশনে সমানভাবে সত্য।
এই যুগান্তকারী গবেষণার নেপথ্যে ছিলেন জাপানের কিউশু ইউনিভার্সিটির ইউয়া কুসুকি, কাভলি ইনস্টিটিউটের হিরোসি ওগুরি, এবং ক্যালটেকের শ্রীদীপ পাল। তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্সর সাম্প্রতিক সংখ্যায় এবং নির্বাচিত হয়েছে এডিটর’স সাজেশন হিসেবে। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা একে দেখছেন কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মহামাইলফলক হিসেবে।
যে ধোঁয়াটে কোয়ান্টাম রহস্য এতদিন বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছিল, আজ সেটাই এক সুশৃঙ্খল নিয়মে ধরা দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই নিয়মই একদিন দাঁড় করাবে উন্নত কোয়ান্টাম কম্পিউটার, যেটা মুহূর্তের মধ্যেই সমাধান করবে জটিল সমীকরণ। এই নিয়মই জন্ম দেবে নতুন কোয়ান্টাম কমিউনিকেশন ব্যবস্থা, যেখানে তথ্য আদানপ্রদান হবে ভঙ্গুরহীন, অবিচ্ছেদ্য এবং নিরাপদভাবে।
কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট আজ আর কেবল রহস্য নয় বরং ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ভিত্তি।
© তানভীর হোসেন
তথ্যসূত্র: সাইন্স ডেইলি ডট কম।
Comments