দুই যমজের অভিযান


১৯৭৭ সাল ছিল মানুষের মহাকাশ অভিযানের এক ঐতিহাসিক বছর। সেই বছর নাসার দু’টো মহাকাশযান, "ভয়েজার ১" আর "ভয়েজার ২", যাত্রা শুরু করেছিল পৃথিবী থেকে। এরা যেন দু’টি যমজ বোন, চেহারায় আর উদ্দেশ্যে প্রায় অভিন্ন। তবে মিশনের সূক্ষ্মতা আর গন্তব্যের দিক থেকে ওরা ছিল খানিকটা আলাদা। ওদের উদ্দেশ্য ছিল সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোকে কাছ থেকে দেখা এবং পৃথিবীতে তাদের খবর পৌঁছে দেওয়া।

১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট প্রথম উড়াল দেয় "ভয়েজার ২"। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে তার যমজ বোন "ভয়েজার ১"। অর্থাৎ "ভয়েজার ২" আগে যাত্রা শুরু করেছিল, কিন্তু দ্রুততর গতির কারণে কিছুদিনের মধ্যেই "ভয়েজার ১" সামনে চলে যায়।

"ভয়েজার ১"-এর লক্ষ্য ছিল বৃহস্পতি আর শনিকে কাছ থেকে দেখা। তার পাঠানো ছবিই প্রথম আমাদের চোখে এনেছিল বৃহস্পতির বুকে লাল দাগের ভেতরের ঘূর্ণি আর শণির উপগ্রহ টাইটানের ঘন বায়ুমণ্ডল।

অন্যদিকে "ভয়েজার ২" একে একে বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুনের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়েছে। একমাত্র মহাকাশযান হিসেবে সে ইউরেনাস ও নেপচুনকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে। তার এই সফরে আবিষ্কার হয়েছিল বেশ কিছু নতুন উপগ্রহ, ঝড়ঝঞ্ঝার ছবি আর এসব গ্রহের পরিবেশ সম্পর্কে অমূল্য তথ্য। আশির দশকে এসব আবিষ্কারের খবর পত্রিকার প্রথম পাতায় জায়গা পেত। আমরা সে সময় কাগজে চোখ মেলে পড়তাম আশ্চর্য সব খবর—বৃহস্পতির বজ্রঝড়, শনি গ্রহের বলয়, কিংবা নেপচুনের রহস্যময় ঝড়ো বাতাস।

গ্রহগুলোর মিশন শেষ করে "ভয়েজার ১" আর "ভয়েজার ২" দু’জনেই চলতে থাকে সামনে। পৃথিবীর টান ছেড়ে বহুদূরে, আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যের পথে। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো, আজ ৪৮ বছর পরেও তারা নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। "ভয়েজার ১" এখন পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে, আর "ভয়েজার ২" অবস্থান করছে প্রায় ২১ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে। দু’জনেই সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে নক্ষত্রদের মাঝের বিশাল অন্ধকারে প্রবেশ করেছে। তাদের গতিও অবিশ্বাস্য, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ কিলোমিটার। তবুও সূর্যের নিকটতম নক্ষত্রে পৌঁছতে তাদের সময় লাগবে চল্লিশ হাজার বছরেরও বেশি।

অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার কাছে অবস্থিত নাসার ডীপ স্পেস কমিউনিকেশন কমপ্লেক্সের বিশাল ডিস এন্টেনার (DSS–43) সাহায্যে আজও বিজ্ঞানীরা যোগাযোগ রেখে চলেছেন মহাকাশের এই দূতদের সঙ্গে। বিশাল রেডিও ডিশ অ্যান্টেনার সাহায্যে প্রতিনিয়ত সংকেত পাঠানো আর গ্রহণ করা হয়। পৃথিবী থেকে "ভয়েজার ২" এর কাছে রেডিও সংকেত পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ১৯ ঘন্টা, আর ফিরে আসতে আরও ১৯ ঘন্টা, মোট প্রায় ৩৮ ঘন্টা। "ভয়েজার ১" এর ক্ষেত্রে এই সময় আরও বেশি, প্রায় ২৩ ঘন্টা, অর্থাৎ এক দফা আদান-প্রদানে প্রায় ৪৬ ঘন্টা।

আমি মাঝেমাঝে নাসার এই ডিপ স্পেস কমিউনিকেশন কমপ্লেক্সের  ভিজিটর সেন্টারে যাই; সেখানে রিয়েল-টাইম ডিসপ্লেতে DSS-43 কখন কাকে সংকেত দিচ্ছে, কোন ফ্রিকোয়েন্সিতে ডেটা নামছে, এসব নিজের চোখে দেখি। সেই বিশাল ডিশটা (DSS -43) ধীরে ধীরে ঘুরে দূর মহাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে আর স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ভয়েজার থেকে পাঠানো ডেটা-স্ট্রিম। এসব দেখলে প্রতিবারই বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকে না। 

এখনো পর্যন্ত "ভয়েজার ২" এর পাঁচটি যন্ত্র সক্রিয় আছে। সেগুলো থেকে বিজ্ঞানীরা পাচ্ছেন কসমিক রশ্মি আর প্লাজমার খবর। অন্যদিকে "ভয়েজার ১" এর যন্ত্রগুলোও মাঝে মাঝে মূল্যবান ডেটা পাঠাচ্ছে। প্রযুক্তির টেকসই শক্তির এমন নিদর্শন সচরাচর দেখা যায় না।

দুই মহাকাশযানেই আছে মানুষের ছবি, ভাষা ও সংগীত সম্বলিত সোনালি ডিস্ক—"গোল্ডেন রেকর্ড"। তাতে পৃথিবীর অবস্থানও চিহ্নিত করা আছে। একদিন যদি এরা অন্য কোনো সভ্যতার হাতে পৌঁছে যায়, তাহলে মানুষের খবর, আমাদের কণ্ঠস্বর, আমাদের সংগীত পৌঁছে যাবে অপর সভ্যতার কাছে।

কিন্তু বাস্তবতার নিয়ম বড় কঠিন। "ভয়েজার ১" ও "ভয়েজার ২" দুটোই চলছে রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর দিয়ে, যার শক্তি প্রতি বছর প্রায় ৪ ওয়াট করে কমে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা হিসেব করছেন, ২০৩০-এর দশক পর্যন্ত হয়তো এদের এক বা দুইটি যন্ত্র চালু রাখা সম্ভব হবে। এরপর এক সময় শক্তি ফুরিয়ে আসবে, ধীরে ধীরে থেমে যাবে সব যন্ত্র। তখন তাদের আর কোনো বার্তা আসবে না পৃথিবীতে, বন্ধ হবে কোলাহল। অনন্ত মহাশূন্যে মিলিয়ে যাবে পৃথিবীর দুই নীরব দূত। কিন্তু ভবিষ্যতের মানুষ মহাকাশ যাত্রার ইতিহাসে চিরকাল মনে রাখবে, দুই যমজ বোনের গ্রহান্তরে অভিযানের কাহিনী।

© তানভীর হোসেন

Comments