কার্ডাশেফ স্কেল বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অসাধারণ ধারণা। যেখানে মানুষ প্রথমবার কল্পনা করেছিলো, সভ্যতাকে তার প্রযুক্তি আর শক্তি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়ে মাপা যায়। ১৯৬৪ সালে সোভিয়েত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাই কার্ডাশেফ এই অভিনব স্কেলটি প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভিনগ্রহী সভ্যতাকে শ্রেণিবদ্ধ করার জন্য একটি বৈজ্ঞানিক কাঠামো তৈরি করা। তিনি ভেবেছিলেন, একটি সভ্যতার শক্তি আহরণ এবং ব্যবহার করার ক্ষমতাই তার প্রযুক্তিগত পরিপক্বতার সর্বোচ্চ সূচক। তাই তিনি সভ্যতার তিনটি ধাপ বা টাইপ নির্ধারণ করলেন।
কার্ডাশেফ স্কেলে সভ্যতার প্রথম স্তর টাইপ ওয়ান, এমন একটি সভ্যতা, যারা তাদের নিজস্ব গ্রহের সব শক্তি, যেমন সূর্যালোক, বায়ুপ্রবাহ, জলপ্রপাত, আগ্নেয়গিরি, সমুদ্রের ঢেউ, এসব কিছুকে সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। মানব সভ্যতা এখনও এই স্তরে পৌঁছায়নি। অনুমান করা হয়, আমরা প্রায় ০.৭ কার্ডাশেফ স্কেলে আছি, যেখানে আমরা আমাদের গ্রহের শক্তি আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছি কিন্তু এখনও পুরোপুরি নয়।
সভ্যতার দ্বিতীয় স্তর, টাইপ টু অনেক বেশি কল্পনাপ্রসূত। এখানে এমন একটি সভ্যতার কথা বলা হয়েছে, যারা তাদের নিজস্ব সূর্য বা নক্ষত্র থেকে উৎপন্ন শক্তির পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। এর জন্য তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ফ্রিম্যান ডাইসন কল্পনা করেছিলেন, ডাইসন স্ফিয়ার নামের বিশাল এক গঠন, যেটা নক্ষত্রের চারপাশে ঘিরে থেকে তার সমস্ত শক্তি সংগ্রহ করবে।
তৃতীয় স্তরে রয়েছে, টাইপ থ্রি সভ্যতা, যেটা পুরো একটি গ্যালাক্সির শক্তি ব্যবহার করতে পারবে। কল্পনা করা হয়, এরকম সভ্যতা প্রায় দেবত্বসদৃশ হবে, যারা বিলিয়ন বিলিয়ন তারকার শক্তিকে তাদের প্রযুক্তি আর জ্ঞান দিয়ে কাজে লাগাবে।
কার্ডাশেফ মূলত এই তিনটি ধাপই নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বিজ্ঞানীরা এই স্কেলটিকে আরো সম্প্রসারিত করেন। কেউ কেউ টাইপ ফোরের এর কথা বলেছেন, যেখানে সভ্যতা গোটা মহাবিশ্বের শক্তিকে ব্যবহার করতে পারবে। আবার আরও কল্পনাপ্রসূতভাবে টাইপ ফাইভ সভ্যতার ধারণা এসেছে যারা বহুবিশ্ব বা মাল্টিভার্সের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে। টাইপ সিক্স তো একেবারেই দার্শনিক পর্যায়ের কল্পনা, যেখানে সভ্যতা সময়, স্থান এবং এমনকি মাত্রার সীমার বাইরেও অস্তিত্ব লাভ করবে।
কার্ডাশেফ স্কেলের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো এটি আমাদের নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দেয়। আমরা বুঝতে পারি, মহাবিশ্বের শক্তি কতটা বিশাল, আর আমরা তার কত সামান্য অংশ ব্যবহার করতে পারি। একই সঙ্গে এটি আমাদের কল্পনার ডানা মেলে দেয়। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি কোথায় পৌঁছাতে পারে সেটা ভাবার সাহস জোগায়।
১৯৮০-এর দশকে কার্ল সেগান তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'কসমসে' কার্ডাশেফ স্কেলের সম্ভাবনা সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরেন, যেটা তার বিজ্ঞানচিন্তাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। তিনি একটি লগারিদমিক সূত্র প্রস্তাব করেন, যাতে সভ্যতার প্রকৃত অবস্থান নির্ণয় করা যায়। অর্থাৎ আমরা যে টাইপ ০.৭ সভ্যতায় আছি এই হিসেবটা তাঁর কাছ থেকেই এসেছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবলে সবচেয়ে প্রথমে আসে শক্তি আহরণের নতুন প্রযুক্তির কথা। মানবসভ্যতা এখনো টাইপ ওয়ানে পৌঁছায়নি, কিন্তু নবায়নযোগ্য শক্তি যেমন সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জোয়ার-ভাটা কিংবা ভূ-তাপীয় শক্তির দ্রুত বিস্তার আমাদের সেদিকেই এগিয়ে নিচ্ছে। আরও এক বিপ্লব ঘটতে পারে ফিউশন এনার্জি থেকে। সূর্যের ভেতরে হাইড্রোজেন একীভূত হয়ে যে শক্তি তৈরি হয়, সেই প্রক্রিয়াকে আমরা যদি পৃথিবীতে আয়ত্ত করতে পারি, তবে আমাদের হাতে প্রায় সীমাহীন শক্তির উৎস চলে আসবে। এটি হবে টাইপ ওয়ান থেকে টাইপ টুতে যাবার পথে প্রথম পদক্ষেপ।
কিন্তু টাইপ টু এর মূল ধারণা আসে মহাকাশ থেকে। যদি আমরা পৃথিবীর বাইরে সৌর প্যানেলের বিশাল নেটওয়ার্ক স্থাপন করতে পারি, কিংবা সূর্যকে ঘিরে এক বিশাল ডাইসন স্ফিয়ার তৈরি করতে পারি, তবে আমরা আমাদের নক্ষত্রের প্রায় সমস্ত শক্তি নিজেদের প্রযুক্তির জন্য ব্যবহার করতে পারবো।
আজকের দিনে এটিকে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি মনে হলেও, মহাকাশে উপনিবেশ স্থাপন বা মঙ্গল গ্রহে মানব বসতি গড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রয়োজনীয়তা বেড়ে উঠতে পারে।
এরপর আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গ। AI কেবল মানুষের মতো চিন্তা করে না, বরং জটিল শক্তি ব্যবস্থাপনা, গ্যালাক্সি-স্তরের অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন পদার্থবিদ্যার রহস্য উদঘাটনেও সাহায্য করতে পারে। এক পর্যায়ে AI হয়তো মানুষের চেয়েও দক্ষভাবে শক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করবে, এবং মানব সভ্যতার অগ্রগতি বহুগুণে দ্রুত ঘটাবে। একই সঙ্গে মহাকাশে উপনিবেশ স্থাপন সভ্যতার শক্তি চাহিদার ধরন বদলে দেবে। যখন মানুষ চাঁদ, মঙ্গল বা গ্রহাণুতে স্থায়ী বসতি গড়বে, তখন শক্তি ব্যবহারের দিগন্ত কেবল পৃথিবী নয়, পুরো সৌরজগতের দিকেই প্রসারিত হবে।
তবে এই যাত্রার সাথে একটি মৌলিক প্রশ্ন সবসময় থেকে যাবে, আমরা কি শক্তির সীমাহীন ব্যবহার শিখে কেবল প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর হবো, নাকি নৈতিকতা, পরিবেশ সচেতনতা আর বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকেও সমান অগ্রগতি ঘটাবো?
শেষ পর্যন্ত কার্ডাশেফ স্কেল কেবল একটি বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি নয়, বরং মানবজাতির স্বপ্ন আর সম্ভাবনার প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাবিশ্ব এক অনন্ত শক্তির ভাণ্ডার, আর মানুষ একদিন হয়তো সেই ভাণ্ডারের দ্বার উন্মোচন করবে। আর সেই দিনই হবে আমাদের মানব সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা, আমরা কি শক্তির মোহে অন্ধ হবো, নাকি জ্ঞান, নৈতিকতা আর মহত্ত্বের সমন্বয়ে এক পরিপূর্ণ মহাজাগতিক সভ্যতা হয়ে উঠবো।
© তানভীর হোসেন
Comments