নিউটন এবং আইনস্টাইন

সপ্তদশ শতাব্দীতে একদিন বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের মনে প্রশ্ন জাগলো, গাছ থেকে আপেল নিচে পড়লো কেন? মানুষ আগে ভাবতো, সব জিনিস তো এমনিতেই নিচে পড়বে, এ নিয়ে আলাদা করে প্রশ্ন করার কিছু নেই। কিন্তু নিউটন সেভাবে ভাবলেন না। তিনি মনে করলেন, হয়তো কোনো অদৃশ্য বল আপেলটিকে নিচে টানছে। সেখান থেকেই তাঁর চিন্তার সূত্রপাত। পরে তিনি দেখালেন, শুধু আপেল নয়, মহাবিশ্বের সকল বস্তুই আসলে পরস্পরকে আকর্ষণ করছে। যে বস্তুর ভর যত বেশি, তার আকর্ষণও তত বেশি। পৃথিবী যেহেতু বিশাল, তাই তার টান এত প্রবল যে ক্ষুদ্র আপেলের পক্ষে তাকে এড়ানো অসম্ভব। এই অদৃশ্য টানকে নিউটন নাম দিলেন মহাকর্ষ। একটি সহজ সমীকরণ দিয়েই তিনি মহাকর্ষ বলের গাণিতিক ব্যাখ্যা করলেন।
এর পাশাপাশি তিনি বল ও গতির সম্পর্ক বোঝালেন তাঁর বিখ্যাত তিনটি গতিসূত্রের মাধ্যমে। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন ক্যালকুলাসের অন্যতম আবিষ্কারক (লাইবনিজের সঙ্গে সমসাময়িকভাবে)। আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণেও তিনি বহু পরীক্ষা করেছিলেন। বলা যায়, তিনি তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তাই তাঁকে বলা হয় ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের জনক। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী স্যার আইজ্যাক নিউটনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবি আলেকজান্ডার পোপ লিখেছিলেন:
"Nature and Nature's laws lay hid in night:
God said, Let Newton be! and all was light."

এই পঙ্ক্তিতে বোঝানো হয়েছে, নিউটন যেন ঈশ্বরপ্রদত্ত আলোকবর্তিকা, যিনি প্রকৃতির অন্ধকার রহস্য উন্মোচন করেছিলেন।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞানের রঙ্গমঞ্চে এসে আবির্ভূত হলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তাঁর বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে সময় ও গতির এক যুগান্তকারী সম্পর্ক তুলে ধরা হলো। তিনি বললেন, সময় কোনো ধ্রুব ব্যাপার নয়, এটি আপেক্ষিক। বস্তুর গতি যত বাড়বে, তার জন্য সময়ের প্রবাহ তত ধীর হবে। আলোর গতির কাছাকাছি পৌঁছালে সময় প্রায় থেমে যাবে, দৈর্ঘ্য সংকুচিত হবে, আর ভর অসীমের দিকে যাবে। ফলে কোনো ভরযুক্ত বস্তু কখনও আলোর গতিতে পৌঁছাতে পারে না। আলোর গতিই মহাবিশ্বে বস্তুর চূড়ান্ত গতিসীমা।

পরে সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে আইনস্টাইন মহাকর্ষকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে ব্যাখ্যা করলেন। তিনি বললেন, ভরযুক্ত বস্তু স্থান-কালের বুননকে বাঁকিয়ে দেয়, আর এই বক্রতার ফলেই মহাকর্ষ বল অনুভূত হয়। ভর যত বেশি, স্থান-কালের বক্রতাও তত বেশি। অর্থাৎ মহাকর্ষ আসলে কোনো অদৃশ্য টান নয়, বরং স্থান-কালের জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য। এতে বোঝা গেল, নিউটনের সূত্র সীমিত ক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে কাজ করলেও মহাবিশ্বের গভীর রহস্য বুঝতে আইনস্টাইনের তত্ত্ব দরকার।

সেই সময় এক ব্রিটিশ কবি, জে. সি. স্কোয়ার, আলেকজান্ডার পোপের কবিতার সাথে মজার ছলে আরও দু’টি লাইন জুড়ে দিলেন:

"It did not last: the Devil howling ‘Ho!
Let Einstein be! restored the status quo."

তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, আইনস্টাইন যেন আবার প্রকৃতিকে রহস্যময় করে দিলেন।

আসলে বিজ্ঞানে শেষ কথা বলে কিছু নেই। একেকজন জ্ঞানী মানুষ এসে একেক ধাপ উন্মোচন করেন, আবার নতুন রহস্যের দুয়ার খোলা হয়। নিউটন ও আইনস্টাইন সেই অন্তহীন অভিযাত্রার দুই মহান দিশারী, যাঁদের হাত ধরে মানুষ প্রকৃতিকে জানার পথে অনেকদূর এগিয়ে গেছে।

© তানভীর হোসেন

Comments