বিবর্তনের দীর্ঘ যাত্রা


জীবজগতের পরিবর্তন নিয়ে মানুষের মনে সব সময়ই কৌতুহল ছিল। গাছপালা, পশুপাখি, এমনকি ক্ষুদ্রতম জীব কেনই বা সময়ের সাথে সাথে বদলে যায়? কেন এই পৃথিবীতে এত জীব বৈচিত্র্য? এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছিল জীব বিবর্তনের ধারণা। আর এই ধারণা কোনো একদিনে আসেনি; এসেছে যুগে যুগে, সভ্যতা থেকে সভ্যতায়, নানা মানুষের কৌতূহল আর চিন্তার ভেতর দিয়ে।

নবম শতকের বাগদাদে, মুসলিম সভ্যতার সেই সুবর্ণযুগে, আল-জাহিজ (৭৭৬–৮৬৯) নামের এক অদম্য কৌতূহলী মানুষ লিখলেন তাঁর বিখ্যাত বই, কিতাব আল-হাইওয়ান বা প্রাণীদের পুস্তক। সেখানে তিনি বললেন, প্রাণীরা টিকে থাকার জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে, যোগ্যরা টিকে থাকে, দুর্বলরা হারিয়ে যায়। তাঁর পাণ্ডুলিপি পড়লে মনে হয়, তিনি যেন কয়েক শতাব্দী আগেই বিবর্তনবাদের আবছা আলো দেখতে পেয়েছিলেন।

এরপর ইবনে মিসকাওয়াইহ (৯৩২–১০৩০) জীবনের ধাপে ধাপে ওঠার তত্ত্ব নিয়ে লিখলেন।
আল-ফাওয আল-আসগর গ্রন্থে তিনি বলেছিলেন, জড় পদার্থ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে উদ্ভিদ, তারপর প্রাণী, আর সবশেষে মানুষ পর্যন্ত জীবনের এক ধারাবাহিক রূপান্তর ঘটে। 

নাসিরুদ্দিন তুসি (১২০১–১২৭৪) আখলাক-ই নাসিরি গ্রন্থে লিখেছিলেন প্রজাতি কীভাবে সময়ের সাথে সাথে ভেতরে ভেতরে বদলে যায়, কীভাবে নতুন রূপ তৈরি হয়। তাঁদের এই সব চিন্তাভাবনা হয়তো ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছায়নি, কিন্তু মুসলিম সভ্যতার ভেতরে রেখে গেছে জ্ঞানের এক উজ্জ্বল আলো।

তারপর কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে গেল। ইউরোপে রেনেসাঁর পর বৈজ্ঞানিক বিপ্লব শুরু হলো। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে জীববিজ্ঞানে নানা আবিষ্কার হতে লাগল। ক্যারোলাস লিনিয়াস প্রজাতির শ্রেণিবিন্যাসের এক নতুন পদ্ধতি দিলেন। জর্জ কুভিয়ে দেখালেন, জীবাশ্ম কেবল পাথরে আটকে থাকা আকৃতি নয়, এগুলো একসময় বেঁচে থাকা প্রাণীদের চিহ্ন। আরেক বিজ্ঞানী জ্যঁ-বাতিস্ত লামার্ক প্রস্তাব করলেন, প্রাণীরা তাদের অর্জিত বৈশিষ্ট্য উত্তরাধিকারসূত্রে পরবর্তী প্রজন্মে দিতে পারে। যদিও তাঁর ধারণা আজ আর টিকে নেই, তবুও তিনি বিবর্তনের ধারণায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন।

অবশেষে উনিশ শতকে এসে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন চার্লস ডারউইন (১৮০৯–১৮৮২)। তাঁর জীবনকালের অন্যতম বড় অভিজ্ঞতা ছিল এইচএমএস বিগল জাহাজে পাঁচ বছরের ভ্রমণ। তিনি দক্ষিণ আমেরিকার গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করেছিলেন পাখিদের ঠোঁটের আকার পরিবেশ ভেদে বদলায়। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ শেষে তিনি ১৮৫৯ সালে প্রকাশ করলেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ, "অন দি অরিজিন অফ স্পিসিস"। সেখানে তিনি দেখালেন, প্রজাতি কোনো স্থির সত্ত্বা নয়, বরং প্রজাতি ক্রমাগত বদলে যায়। আর এই বদলের মূল চালিকাশক্তি হলো ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন। যারা পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারে, তারাই টিকে থাকে, তারাই তাদের বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়। এ যেন আল-জাহিজের  হাজার বছরের পুরনো সেই ধারণার নতুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। 

তবে ডারউইন একা ছিলেন না। তখন মালয় দ্বীপপুঞ্জের গভীর অরণ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন আরেক প্রকৃতিবিদ, আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস (১৮২৩–১৯১৩)। তিনিও স্বাধীনভাবে পৌঁছে গিয়েছিলেন একই সিদ্ধান্তে; জীবন বদলায় এবং টিকে থাকে যোগ্যরা। ১৮৫৮ সালে ডারউইন ও ওয়ালেসের গবেষণা একসাথে উপস্থাপিত হলো, আর পৃথিবী পেল নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি; বিবর্তন জীবের টিকে থাকার প্রাকৃতিক নিয়ম।

কিন্তু বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গ্রেগর মেন্ডেল মটরশুটি গাছের ওপর পরীক্ষা করে আবিষ্কার করেছিলেন বংশগতির নিয়ম, যদিও তাঁর কাজ তখন অজ্ঞাতই রয়ে গিয়েছিল। বিংশ শতকের শুরুতে তাঁর গবেষণা পুনরাবিষ্কৃত হলে জীববিজ্ঞান পেল নতুন মোড়। ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন আর মেন্ডেলের বংশগতির নিয়ম মিলে ১৯৩০-৪০ এর দশকে জীববিজ্ঞানে তৈরি হলো,  "মডার্ন সিনথেসিস" তত্ত্ব, যেখানে বলা হলো, জিনের পরিবর্তন আর তার ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাবেই ঘটে জীবের বিবর্তন।

এরপর ১৯৫৩ সালে ওয়াটসন আর ক্রিক যখন ডিএনএর ডবল হিলিক্স গঠন আবিষ্কার করলেন, তখন বিবর্তন তত্ত্ব পেল জৈব রাসায়নিক এক শক্ত ভিত্তি। আমরা জানলাম, বিবর্তনের সূক্ষ্ম ধাপগুলো লেখা থাকে ডিএনএর অক্ষরে। শুধু পরিবেশ নয়, জিনের মিউটেশন, জেনেটিক ড্রিফট কিংবা অভিবাসনও বিবর্তনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

আজকের দিনে এসে বিবর্তনের গবেষণা আরও সূক্ষ্ম ও বিস্তৃত।
এভ্যুলেশনারি ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজি বা Evo-Devo দেখাচ্ছে, জীবের ভ্রূণ বিকাশের সময় যেসব বিশেষ “হক্স জিন” (Hox gene) কাজ করে, সেগুলো আসলে লক্ষ কোটি বছর ধরে সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন প্রাণীতে। অর্থাৎ মাছ, পোকা, এমনকি মানুষের জিনোমেও একই ধরণের নিয়ন্ত্রক জিন কাজ করে, যেগুলো শরীরের কাঠামো গঠনে দিকনির্দেশনা দেয়। এক ভাবে বলতে গেলে, বিবর্তন শুধু নতুন কিছু তৈরি করেনি, এর পাশাপাশি পুরোনো নকশার ওপর পরিবর্তন এনে তৈরি করেছে জীবের বৈচিত্র্যময় রূপ।

ডিএনএ প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির কারণে বিজ্ঞানীরা এখন বিভিন্ন প্রাণীর সম্পূর্ণ জিনোমের তুলনা করতে পারছেন। মানুষের জিনোম উন্মোচন হলো ২০০৩ সালে, আর আজ আমরা জানি, মানুষের জিনোমের প্রায় ৯৮ শতাংশই মিলে যায় শিম্পাঞ্জির জিনোমের সাথে। জীবাশ্মের পাশাপাশি জিনোমই এখন প্রধান প্রমাণ, কিভাবে কোটি কোটি বছরে জীবজগত তার রূপ বদলেছে। প্রাচীন নেয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানদের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, আধুনিক মানুষের ভেতরেও তাদের জিন এখনো বেঁচে আছে।

আধুনিক যুগে আরও যুক্ত হয়েছে নতুন এক প্রমাণ, "মলিকিউলার ক্লক" পদ্ধতি, যেখানে ডিএনএর পরিবর্তনের হার মেপে জীববিজ্ঞানের টাইমলাইনে কত বছর আগে কোন বিভাজন ঘটেছিল সেটা অনুমান করা যায়। আবার জীবাশ্ম ও জিনোম বিশ্লেষণ করে আমরা এখন জানি, প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসরের বিলুপ্তিই স্তন্যপায়ীদের জন্য নতুন পথ খুলে দিয়েছিল।

বিবর্তনের এই কাহিনি আসলে এক দীর্ঘ নদীর মতো। এর উৎস বহু দূরে, বহু সভ্যতার চিন্তার ভেতরে। আল-জাহিজের কলম থেকে শুরু করে ডারউইন-ওয়ালেসের পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি, মেন্ডেলের বংশগতির নিয়ম, ওয়াটসন-ক্রিকের ডিএনএর গঠন আবিষ্কার, আধুনিক জিনোম গবেষণা, evo-devo এসব মিলেই গড়ে উঠেছে বিবর্তনের এক বিশাল ইতিহাস। এখন আমরা জানি, আমাদের চারপাশে যে জীববৈচিত্র্য দেখতে পাই তার মূলে রয়েছে বিবর্তন। প্রকৃতিতে জীবজগতের টিকে থাকার মূল চালিকাশক্তি।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বিবর্তন কি থেমে গেছে? যদি থেমে না গিয়ে থাকে তাহলে আমরা কেন নতুন প্রজাতির উদ্ভব চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি না। ‌এই প্রশ্নের উত্তরে হলো, বিবর্তন থেমে যায়নি, বরং আজও সেটা চলমান রয়েছে। 

তবে ব্যাপারটা এমন নয় যে  প্রতিদিন আমরা চোখের সামনে নতুন নতুন প্রজাতি তৈরি হতে দেখবো। বিবর্তন একটি ধীর এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যার প্রভাব বোঝা যায় প্রজন্মের থেকে প্রজন্মের পর। 

কিন্তু বর্তমানেও বিবর্তনের বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া। কয়েক দশক আগেও অনেক অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সহজেই ব্যাকটেরিয়াকে মারতে পারত, কিন্তু আজ বহু ব্যাকটেরিয়া সেই একই ওষুধে আর মরে না। এর কারণ হলো, ব্যাকটেরিয়া নিজের ভেতরে জেনেটিক পরিবর্তন ঘটিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক
প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলেছে। এটি বিবর্তনের একটি সরাসরি প্রমাণ। একইভাবে কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী পোকামাকড়ের উদাহরণও দেয়া যায়।

আরেকটি প্রমাণ হলো মানুষের মধ্যেই কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন। যেমন, এক সময়কার ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষ ল্যাকটোজ থাকার কারণে  গরুর দুধ সহজে হজম করতে পারত না। কিন্তু কয়েক হাজার বছরে মানুষের মধ্যে "ল্যাক্টোজ টলারেন্স" নামের একটি জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে অনেক মানুষের পক্ষেই গরুর দুধ হজম করা এখন আর কোন সমস্যা নয়। তাছাড়া, উচ্চভূমিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অক্সিজেন কম থাকা সত্ত্বেও বেঁচে থাকার মতো শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন হয়েছে। তিব্বতি বা আন্দিজ পর্বতের মানুষদের শরীরে তার প্রমাণ মেলে।

বিজ্ঞানীরা আরও দেখিয়েছেন, আমাদের শরীরের ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা সময়ের সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে। কারণ হলো, ভাইরাসের  জেনেটিক কোড দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড ১৯ মহামারি আমাদেরকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে, ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের লড়াই এক চলমান বিবর্তনীয় যুদ্ধ।

অতএব, বিবর্তন শুধু অতীতের কোনো ঘটনা নয়, বরং এক অবিরাম প্রক্রিয়া। প্রকৃতির পরিবেশগত চাপ, রোগজীবাণু, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে জীবজগত আজও নতুনভাবে গড়ে উঠছে এবং বদলাচ্ছে। প্রখ্যাত জেনেটিসিস্ট থিওডোসিয়াস ডবজানস্কির মতে, "বিবর্তনের প্রিজম দিয়ে দেখা না হলে, জীববিজ্ঞানের কোন কিছুই অর্থবহ হবে না"। 
 
© তানভীর হোসেন

Comments