ষাটের দশকে মার্কিন গবেষক জন বি. ক্যালহাউন ইঁদুরদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভূতপূর্ব পরীক্ষা করেছিলেন। এজন্য তিনি বানালেন এক বিশাল খাঁচা, যেখানে ইঁদুরদের জন্য খাবার, পানি ও আশ্রয়ের কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। শুরুতে মাত্র আটটি ইঁদুর রাখা হয়েছিল সেখানে। অনুকূল পরিবেশে তারা দ্রুত বংশবিস্তার করতে থাকে। শত থেকে হাজারে গিয়ে দাঁড়ায় তাদের সংখ্যা। প্রথমদিকে সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক, প্রকৃতির নিয়মে খাওয়া, ঘুম, মিলন আর সন্তান লালন চলতে থাকে। কিন্তু যখন ভিড় সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখনই দেখা দিল অদ্ভুত সব পরিবর্তন।
অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও সীমিত জায়গা ইঁদুরদের আচরণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করল। শক্তিশালীরা নিজেদের এলাকা গড়ে তুলে দুর্বলদের সরিয়ে দিল। সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ল, মা ইঁদুররা বাচ্চাদের যত্ন নেওয়া বন্ধ করে দিল। পুরুষরা অকারণ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ল। আরেকদল সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে একা একা কোণায় বসে থাকত, যাদের ক্যালহাউন নাম দিয়েছিলেন “beautiful ones”; তারা ছিল বাহ্যিকভাবে সুস্থ-সবল, কিন্তু প্রজনন বা সামাজিকতায় অনাগ্রহী। একে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন “behavioral sink” বা আচরণের নিম্নগামীতা। এই অবস্থায় ভিড়ের চাপে সমাজ ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে থাকে। তারপর শেষ পর্যন্ত ইঁদুরদের পুরো উপনিবেশ জন্মহীনতা ও সহিংসতার কারণে ধ্বংস হয়ে গেল। এই পরীক্ষাটি ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত মোট ২৫ বার চালানো হয়েছিল এবং প্রতিবারই একই ধরনের ধ্বংসাত্মক ফলাফল এসেছিল। এই পরীক্ষার প্রতীকি নাম দেওয়া হয়েছিল, "ইউনিভার্স টুয়েন্টি ফাইভ"।
ইঁদুরের ওপর চালানো এই পরীক্ষাটির পক্ষে এবং বিপক্ষে প্রচুর আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। বিশেষত পরীক্ষার মেথডলজি ও একমুখী ফলাফল নিয়ে অনেকেই সে সময় প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু ইতিহাসবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানীদের মনে এই পরীক্ষাটি নাড়া দিয়েছিল। তার কারণ হলো, অতীতে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ মানব সভ্যতার জন্য বারবার বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
ম্যালথাস বলেছিলেন, জনসংখ্যা সবসময় খাদ্য ও সম্পদের চেয়ে দ্রুত বাড়ে, আর এর পরিণতি হয় দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ ও মহামারী। মায়া সভ্যতার পতনের পেছনে কৃষিজ সম্পদের ঘাটতি ও জনসংখ্যার চাপকে অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়। আবার ইস্টার আইল্যান্ডের বাসিন্দারা যখন সীমিত জমিতে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে নির্বিচারে বনজসম্পদ ধ্বংস করা শুরু করে, তখন একসময় তাদের সমস্ত সম্পদ ফুরিয়ে যায় এবং তাদের সমাজ শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। এমনকি মহাশক্তিশালী রোমান সাম্রাজ্যও সীমাহীন ভিড়, বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সম্পদের ভারসাম্যহীনতার কারণে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ক্ষয়ে গিয়েছিল।
আজকের পৃথিবীতে সেই সতর্কবার্তাই আবার যেন ফিরে আসছে। পৃথিবীর জনসংখ্যা এখন ৮ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। ২০৫৮ সাল নাগাদ এটি ১০ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু ঢাকা, দিল্লি, টোকিও, সাংহাই, সাও পাওলো কিংবা মুম্বাই - এসব বড় বড় মেগাসিটিতে এখনই জনসমুদ্রে উপচে পড়ছে। বহুতল ভবনের গাদাগাদি জীবন, অবিরাম যানজট, বেকারত্ব আর চাকরির জন্য অস্থির প্রতিযোগিতা মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে থেকেও মানুষ নিঃসঙ্গ। পরিবার ছোট হয়ে আসছে, প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন “urban loneliness”, এটা এক ধরনের অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা। যেটা ক্যালহাউনের ইঁদুর সমাজের উদাসীনতার সাথে মিলে যায়।
তবে মানুষ ইঁদুর নয়। আমাদের আছে বুদ্ধি, কল্পনা আর প্রযুক্তির শক্তি। শাসনব্যবস্থা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সামাজিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ের চাপ সামলানোর নতুন উপায় বের করতে পারি। উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার, অনলাইন সম্প্রদায় কিংবা ওয়ার্ক ফ্রম হোমের মতো নতুন কর্মসংস্কৃতি মানুষের জীবনকে এক ভিন্ন ভারসাম্যে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ ভিড় ঠাসা মহানগর ছেড়ে চলে যাচ্ছে ছোট শহর বা গ্রামের দিকে, কেউ আবার গ্রহণ করছে নতুন জীবনধারা। অধিক জনসংখ্যার দেশ ছেড়ে অনেকে অভিবাসন নিয়ে চলে যাচ্ছে কম জনসংখ্যার দেশে। এটাই মানুষের অভিযোজনের বিশেষ ক্ষমতা, এটাই তাকে আলাদা করে তোলে। এই ক্ষমতাই আমাদের মানব সভ্যতার জন্য আশার আলো জ্বালিয়ে রাখে।
তবুও ক্যালহাউনের ইউনিভার্স ২৫ আর ইতিহাসের বার্তা আমাদের অস্বস্তিকরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়, সভ্যতার পতন সবসময় বাইরের আক্রমণে আসে না, ভেতর থেকেও আসতে পারে। যদি অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ আমাদেরকে সম্পর্কহীন, উদাসীন বা কেবল নিজের খোলসের ভেতর বন্দি করে তোলে, তবে সমাজ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে।
তাই আমাদের সামনে খোলা রয়েছে দুই বিপরীত পথ - একদিকে অস্থিরতা, বিভাজন ও ধ্বংস; আর অন্যদিকে পারস্পরিক সহযোগিতা, পরিকল্পনা ও নতুন সমাধানের সম্ভাবনা। আমরা কোন পথ ধরে হাঁটবো, সেটা নির্ভর করে আমাদের আজকের সিদ্ধান্তের উপর।
© তানভীর হোসেন
Comments