জীবনের ভাষা


জীবনের ভাষা বোঝার জন্য ডিএনএ, আরএনএ এবং প্রোটিন এই তিনটি উপাদানকে একসাথে বিবেচনা করতে হবে। ডিএনএ (DNA) হলো জিনগত তথ্যের ভাণ্ডার, যেখানে জীবনের সমস্ত নীলনকশা সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু এই নকশা নিজে থেকে কাজ করতে পারে না।ডিএনএ থেকে বার্তা উঠে আসে আরএনএর (RNA)  মাধ্যমে, এবং সেই বার্তাকে কাজে পরিণত করে প্রোটিন।
এই তিনটি জৈবিক অণুর পারস্পরিক সম্পর্ককে বিজ্ঞানীরা মলিকিউলার বায়োলজির "সেন্ট্রাল ডগমা" বা কেন্দ্রীয় মতবাদ বলে থাকেন; যার মূল অর্থ হলো, ‌ডিএনএ থেকে তৈরি হয় আরএনএ, আর আরএনএ থেকে প্রোটিন। এই প্রোটিনই জীবনের ভাষাকে অর্থবহ করে তোলে। 

ডিএনএ মূলত জীবকোষের নিউক্লিয়াসে ক্রোমোজোমের মধ্যে অবস্থান করে। এর বাইরে মাইটোকনড্রিয়াতেও সামান্য কিছু ডিএনএ থাকে। যখন কোষে প্রোটিন তৈরির প্রয়োজন হয়, তখন ডিএনএ ডবল হিলিক্সের নির্দিষ্ট একটি অংশ খুলে যায় এবং সেখান থেকে আরএনএর একটি কপি তৈরি হয়। এই কপিটিকে বলা হয়, মেসেঞ্জার আরএনএ বা mRNA। এটি যেন ডিএনএর লাইব্রেরি থেকে নেওয়া একটি বার্তার ফটোকপি, যেটা নিউক্লিয়াস থেকে বের হয়ে সাইটোপ্লাজমে চলে যায়। সেখানে রাইবোসোম নামের এক আণবিক কারখানায় পৌঁছে বার্তাটি পড়া হয়।

রাইবোসোমের ভেতরে থাকে রাইবোসোমাল আরএনএ বা rRNA, যেটা পুরো রাইবোজোম যন্ত্রটিকে চালু রাখে। এরপর ট্রান্সফার আরএনএ বা tRNA বিভিন্ন অ্যামিনো অ্যাসিড সংগ্রহ করে রাইবোসোমে নিয়ে আসে। তারপর একটির পর একটি অ্যামিনো অ্যাসিড সাজিয়ে প্রোটিন চেইন তৈরি করে। একেকটি প্রোটিন তৈরি হয় নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে, আর সেই ক্রম নির্ধারণ করে mRNA-তে লেখা ডিএনএর  বার্তা।

প্রাথমিকভাবে তৈরি হওয়া mRNA সবসময় সরাসরি ব্যবহারের উপযোগী হয় না। অনেক সময় ডিএনএ থেকে প্রথমে যে প্রি-mRNA তৈরি হয়, তার ভেতরে কিছু কিছু অপ্রয়োজনীয় অংশ থাকে। তখন স্মল নিউক্লিয়ার আরএনএ বা snRNA সেইসব অপ্রয়োজনীয় অংশকে কেটে বাদ দেয়, একে বলা হয় স্প্লাইসিং। এভাবে বার্তাটি আরও পরিশুদ্ধ ও কার্যকর হয়।

অন্যদিকে কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরএনএ, যেমন মাইক্রো আরএনএ (miRNA) বা স্মল ইন্টারফেয়ারিং আরএনএ (siRNA) কাজ করে বার্তা নিয়ন্ত্রকের মতো। তারা ঠিক করে দেয় কখন কোন বার্তা ব্যবহার হবে, কোনটি বন্ধ থাকবে। ফলে কোষে প্রোটিন উৎপাদনের গতি ও পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত হয়।

ডিএনএ থেকে আরএনএ তৈরির প্রক্রিয়াকে বলা হয়, ট্রান্সক্রিপশন, আর আরএনএ থেকে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়াকে বলা হয়, ট্রান্সলেশন। এই দুইটি ধাপ একসাথে মিলে গঠন করে, জিন এক্সপ্রেশন। এই পুরো ব্যবস্থাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সমন্বিত। 

ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি।ট্রান্সক্রিপশনের সময় আরএনএ পলিমারেজ নামের একটি এনজাইম কাজ করে। এই এনজাইম ডিএনএ ডবল হিলিক্সের একটি স্ট্র্যান্ড বা সুতোর ওপর ভর করে তার একটি পরিপূরক মেসেঞ্জার আরএনএ তৈরি করে দেয়।

এরপর ট্রান্সলেশনের সময় ট্রান্সফার আরএনএ (tRNA) এক ধরনের সেতু হিসেবে কাজ করে। প্রতিটি tRNA এর গায়ে একটি বিশেষ অ্যান্টিকোডন থাকে, যেটা mRNAতে থাকা ট্রিপলেট কোডনের সঙ্গে নিখুঁতভাবে জুড়ে যায়। এই তিন অক্ষরের কোডন আসলে একটি নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিডের সংকেত বহন করে। জেনেটিক কোডে মোট ৬৪টি কোডন রয়েছে, এর ৬১টির মাধ্যমে কুড়িটি অ্যামিনো অ্যাসিডকে চিহ্নিত করা হয় এবং তিনটি বিশেষ "স্টপ কোডন" প্রোটিন সংশ্লেষণ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। এছাড়া একটি বিশেষ "স্টার্ট কোডন" প্রোটিন সংশ্লেষণের সূচনা নির্দেশ করে এবং মিথিওনিন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিডকেও চিহ্নিত করে। এভাবে একের পর এক অ্যামিনো অ্যাসিড সাজতে সাজতে দীর্ঘ পলিপেপটাইড শিকল তৈরি হয়, যেটা পরে ভাঁজ হয়ে একটি কার্যকর প্রোটিনে রূপ নেয়। 

প্রোটিন তৈরি হওয়ার এই বিস্ময়কর প্রক্রিয়াকে জীবনের নিখুঁত অনুবাদ বলা চলে। কারণ এখানে তথ্যের ভাষা নিউক্লিওটাইডের ধারাবাহিকতা থেকে অ্যামিনো অ্যাসিডের শৃঙ্খলে রূপান্তরিত হয়। অথচ জীবনের এই ভাষার বর্ণমালা আশ্চর্যজনকভাবে সংক্ষিপ্ত। এতে রয়েছে শুধুমাত্র চারটি অক্ষর: A, T, G, C। এগুলো ডিএনএ অণুর চারটি নাইট্রোজেন বেসের নাম—অ্যাডেনিন, থাইমিন, গুয়ানিন এবং সাইটোসিন। এই চারটি মাত্র "অক্ষর" দিয়েই প্রকৃতি রচনা করেছে জীবনের সমগ্র অভিধান, যেখানে প্রতিটি কোডন একেকটি শব্দ, আর  প্রোটিন হলো সেই শব্দগুলো দিয়ে তৈরি করা অর্থবহ বাক্য। 

অন্যভাবে বলা যায়, প্রোটিনই হলো জীবনের ভাষার চূড়ান্ত প্রকাশ। কারণ কোষের গঠন, রাসায়নিক বিক্রিয়া, শক্তির রূপান্তর থেকে শুরু করে হরমোন, এনজাইম ও রিসেপ্টরের মতো সমস্ত কার্যকরী উপাদান প্রোটিন দিয়েই গঠিত। অর্থাৎ, প্রোটিন ছাড়া ডিএনএ ও আরএনএর তথ্য কেবল সম্ভাবনার স্তরে থেকে যেত, বাস্তব কোনো কার্যকলাপে রূপ নিত না।

এখানে বলে রাখি, রাইবোসোমের ভেতরে প্রোটিন তৈরি হওয়াটা সবসময় mRNA এর বার্তার ওপর নির্ভরশীল। mRNA না থাকলে রাইবোসোমে সঠিকভাবে কোডন-পাঠ সম্ভব হতো না, ফলে নির্দিষ্ট ক্রমে অ্যামিনো অ্যাসিড বসানো যেত না এবং প্রোটিন তৈরিতে সমস্যা সৃষ্টি হতো। 

মোদ্দা কথা হলো, ডিএনএ তথ্য সংরক্ষণ করে, আরএনএ সেই তথ্যকে বহন ও প্রক্রিয়াজাত করে এবং প্রোটিন সেই তথ্যকে বাস্তবে রূপ দেয়। আবার প্রোটিন ফিরে গিয়ে ডিএনএ ও আরএনএর কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিশেষ একটি প্রোটিন এনজাইম, যার নাম ডিএনএ পলিমারেজ, ডিএনএর প্রতিলিপি তৈরি করে। আবার কিছু প্রোটিন আরএনএ উৎপাদনের হার বাড়ায় বা কমায়। অর্থাৎ কোষের ভেতরে অবিরাম আলাপচারিতা চালাচ্ছে এই তিনটি জৈবিক অণু।

আবার কোন জিন সক্রিয় থাকবে আর কোনটি নিস্ক্রিয় থাকবে, তার অনেকটাই নির্ধারণ করে ক্ষুদ্র আরএনএ অণুগুলির উপর। এর ফলে একই ডিএনএ থাকার পরও চোখের কোষ, স্নায়ুকোষ বা পেশীকোষ সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন কাজ করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীতে জীবনের সূচনা হয়েছিল আরএনএকে কেন্দ্র করে। কারণ আরএনএ তথ্য বহন করতে পারে, আবার একইসঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানোর সক্ষমতাও রাখে। এই দ্বৈত ভূমিকার কারণে আরএনএকে জীবনের প্রথম অনুঘটক হিসেবে ধরা হয়। আজও অনেক ভাইরাস কেবল আরএনএর মাধ্যমেই টিকে আছে, তাদের কোনো ডিএনএ নেই। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে আরএনএ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আধুনিক যুগেও আরএনএ জীববিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো কোভিড-১৯ মহামারির সময় ব্যবহৃত mRNA ভ্যাকসিন। এসব ভ্যাকসিনে ডিএনএ স্পর্শ না করেই সরাসরি মেসেঞ্জার আরএনএ ব্যবহার করে প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, আর আমাদের শরীর সেই প্রোটিনের মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করেছে। জিন সাইলেন্সিং প্রযুক্তি, ক্যান্সার থেরাপি, এমনকি সিনথেটিক জীববিজ্ঞানেও আরএনএকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে আরএনএ নির্ভর ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা মানুষের জীবনযাত্রাকে এক নতুন মাত্রা দিতে পারে।

ডিএনএ, আরএনএ ও প্রোটিনের এই ত্রিমুখী সম্পর্ককে জীবনের আসল ভাষা বলা যায়। ডিএনএ যদি হয় গ্রন্থাগার, আরএনএ হলো সেই গ্রন্থাগারের চলমান বার্তাবাহক ও নিয়ন্ত্রক, আর প্রোটিন হলো তার কার্যনির্বাহী সদস্য। এই তিনজনের নিরবচ্ছিন্ন কথোপকথনেই রচিত হয়েছে জীবনের মহাকাব্য, আর তার ফলে প্রতিটি কোষ নিখুঁতভাবে নিজের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।

© তানভীর হোসেন

Comments