অস্ট্রেলিয়ার কৃষি বিপণনের ইতিহাসে "ফ্রাঙ্কলিন" বার্লি কেবল একটি শস্যের উন্নত জাত নয়, বরং ছিল যুগান্তকারী এক আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮১ সালে তাসমানিয়ার এক সরকারি গবেষণা কেন্দ্রে "শ্যানন" আর "ট্রায়াম্ফ" নামের দুটো বার্লির জাতকে সংকরায়ণ করে তৈরি করা "ফ্রাঙ্কলিন" নামের এই নতুন বার্লির জাত খুব দ্রুতই কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই বার্লির দানা ঝকঝকে সুন্দর, ফলন ভালো, আর গুণগত মানে ছিল অনন্য।
তাসমানিয়ার প্রাদেশিক সরকার তখন বুঝতে পেরেছিল এর সম্ভাবনা, তাই কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্ভিদ প্রজনন অধিকার বা প্ল্যান্ট ব্রিডার্স রাইটস (PBR) আইনের আওতায় এর আইনি সুরক্ষা নিয়েছিল। এই সুরক্ষার অর্থ হলো, "ফ্রাঙ্কলিন" বার্লি ব্যবহার বা বাজারজাত করার অনুমতি কেবল তাসমনিয়া সরকার এবং তার লাইসেন্সধারী এজেন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কৃষি বিপণন ব্যবস্থা এত সরল রৈখিক নয়। বিশেষত যেখানে বিপুল পরিমাণ শস্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার বিশাল শস্য বিপণন সংস্থা, "গ্রেইন পুল", সরাসরি বাজার থেকে "ফ্রাঙ্কলিন" বার্লি কিনে নিয়ে বিদেশে রপ্তানি শুরু করলো। তাদের বক্তব্য ছিল, যখন কোন শস্যের বীজ বাজারে বিক্রি হয়ে গেছে, তখন সেটি তো সাধারণ কৃষিপণ্য। সেখান থেকে ফসল ফলানো বা বিক্রির অধিকার থেকে আর কাউকে আটকে রাখা যায় না।
অন্যদিকে তাসমানিয়া সরকার ও তাদের লাইসেন্সধারী কোম্পানি কালটিভস্ট বলল, এই বার্লি ভ্যারাইটিটি দীর্ঘ গবেষণা আর সৃজনশীলতার ফসল, তাই তাদের অনুমতি ছাড়া এর বাণিজ্যিক ব্যবহার আইনসিদ্ধ নয়।
এভাবে ফ্রাঙ্কলিন বার্লি নিয়ে বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব চরমে উঠলে সেটা পৌঁছে গেল দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টে। আদালতের কাছে মূল প্রশ্ন ছিল, অস্ট্রেলিয়ার সংবিধানের ৫১(১৮) ধারায় বলা আছে—“পেটেন্ট অব ইনভেনশন” বা আবিষ্কারের পেটেন্ট দেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের আছে। কিন্তু নতুন উদ্ভিদের জাতকে কি সেই ধরনের “আবিষ্কার” বলা যায়? অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি করা পিবিআর আইন কি বৈধ?
অস্ট্রেলিয়ার হাইকোর্টের ফুল বেঞ্চে দীর্ঘ শুনানির পর সিদ্ধান্ত হলো, হ্যাঁ, নতুন উদ্ভিদের জাতও অস্ট্রেলিয়ার সংবিধানের সেই উদ্ভাবনের সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে। ২০০০ সালে দেয়া এক রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিল, "ফ্রাঙ্কলিন" বার্লির মতো নতুন জাতের উপর প্রজনন অধিকার আইন সম্পূর্ণ বৈধ। এই রায় শুধু কৃষি নয়, আইন ও সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল।
তবে হাইকোর্ট এটাও জানিয়ে দিল, পিবিআর পেটেন্টের মতোই এক ধরনের মেধাসত্ব। অর্থাৎ এটি এক ধরনের এক্সক্লুসিভ রাইট বা “নিষেধাজ্ঞার অধিকার”, এর অধিকারী চাইলে অন্যকে থামাতে পারবেন। কিন্তু ফসল নিজে বাজারজাত করার ক্ষেত্রে তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
এই ঐতিহাসিক রায়ের পর, ২০০৪ সালে এসে ফেডারেল কোর্টে এই লড়াই আরেক নতুন মোড় নিল। সেখানে বলা হলো, একবার ফসলের বীজ বাজারে বিক্রি হয়ে গেলে, উদ্ভিদ প্রজনন অধিকার বা পিবিআর কার্যত শেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ, কৃষক তার কেনা বীজ থেকে ফসল ফলালে সেই শস্যের উপর ব্রিডারের অধিকারের দাবি আর চলবে না। কারণ এই অধিকারটি মূলত বীজের উপর, ফসলের উপর নয়। কিন্তু বীজ হিসেবে বিক্রি করতে গেলে, উদ্ভিদ প্রজনন অধিকার আইন আবার ফিরে আসবে।
এই পুরো ঘটনা শুধু একটি ফসলের অধিকার নিয়ে আইনি লড়াই নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার কৃষি অর্থনীতির বাস্তবতা ও আইনি কাঠামোর সংঘাতও তুলে ধরেছিল। অস্ট্রেলিয়ার জন্য শস্য রপ্তানি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সেক্টর, বর্তমানে এটা প্রায় কুড়ি বিলিয়ন ডলারের বিশাল ইন্ডাস্ট্রি। বিদেশি বাজারে প্রতিযোগিতা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি আর জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থ এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া গ্রেইন পুল যুক্তি দিচ্ছিল কৃষকের স্বাধীনতা আর দেশের রপ্তানির স্বার্থের কথা, আর তাসমানিয়ার সরকার ও তার সহযোগীরা জোর দিচ্ছিল উদ্ভাবকের শ্রম আর গবেষণার স্বীকৃতির দিকে।
আমি নিজেও তখন পরীক্ষক হিসাবে পিবিআর অফিসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলাম। সে সময় খুব কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে এই মামলা দেশের নীতি-নির্ধারক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। হাইকোর্টের রায় শুধু একটি বার্লির জাতের ভাগ্য নির্ধারণ করেনি, বরং গোটা অস্ট্রেলিয়ার কৃষি বাণিজ্যের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। জৈব প্রকৃতিকে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে রূপান্তরিত করা হলে সেই শ্রমকে আইন কতটা সম্মান জানাবে সেটাও এই আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ফয়সালা হয়েছিল।
"ফ্রাঙ্কলিন" বার্লি নিয়ে এই আইনি টানাপোড়েন কৃষক, বিজ্ঞানী, বাজার ব্যবস্থাপক, নীতি-নির্ধারক আর আইনজীবী- সবাইকে এক মঞ্চে দাঁড় করিয়েছিল। এই দীর্ঘ আইনি লড়াই আমাদের শিখিয়েছিল, উদ্ভাবনের মর্যাদা আর কৃষকের স্বার্থ দুটোকে সামঞ্জস্য রেখেই কৃষি অর্থনীতিকে উন্নয়নের পথে এগোতে হয়।
অস্ট্রেলিয়ার পিবিআর আইন আসলে শুধু বীজের উপর অধিকার দেয়, ফসলের উপর নয়। তাই কৃষক বৈধভাবে বীজ কিনলে, সেই শস্য বিক্রি করতে গিয়ে ব্রিডার আর রয়্যালটি দাবি করতে পারতেন না।
এখানেই সামনে আসে ফ্রাঙ্কলিন বার্লি মামলা। কৃষক আর ব্রিডারের টানাপোড়েন থেকে জন্ম নিল এক অভিনব সমাধান যার নাম, এন্ড পয়েন্ট রয়্যেলটি বা EPR। এটা এক ধরনের চুক্তিভিত্তিক বীজ বিপণন ব্যবস্থা।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একজন কৃষক যখন পিবিআর সুরক্ষিত জাতের বীজ কেনেন, তখন এক ধরনের EPR চুক্তি মেনে নেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী ফসল বিক্রির সময়, প্রতি টন শস্য থেকে একটি নির্দিষ্ট হারে রয়্যালটি সরাসরি ব্রিডারের কাছে চলে আসে।
এই পদ্ধতির ফলে বীজের সুরক্ষা এবং ফসলের আয়, দুটোই নিশ্চিত হলো। আর অস্ট্রেলিয়ার কৃষি অর্থনীতিতে তৈরি হলো এক নতুন ধারা।
© তানভীর হোসেন
Comments