আয়ুষ্কাল


বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, পৃথিবীর মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩২ বছর। ২০২০ সালে এসে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ বছরে। দেশ ও জাতি ভেদে এই সংখ্যাটি কিছুটা কমবেশি হতে পারে। ‌ কিন্তু ‌মোদ্দা কথা হলো, গত ১২০ বছরে মানুষের গড় আয়ু দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কিভাবে সম্ভব হলো?

এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে পৃথিবীতে শিশু মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ১৯০০ সালের দিকে এক হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় ১৬৫ জন শিশু এক বছর হওয়ার আগেই মারা যেত। এখন সেই সংখ্যা ৩৭ এ নেমে এসেছে। মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কম সন্তান জন্ম দেওয়া, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তৃতি, সুপেয় পানির ব্যবহার—এসব কারণে শিশু মৃত্যুর হার এখন অনেক কমে গেছে। নিঃসন্দেহে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি একটি বিশাল ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে।

কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ নয়। মানুষের গড় আয়ু বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো গত শতাব্দীতে জীবনযাত্রার মানের উন্নতি এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে বৈপ্লবিক অগ্রগতি। মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা অনেক বেড়েছে। আগে যেসব সংক্রামক রোগে সহজেই মানুষ মারা যেত, অ্যান্টিবায়োটিক ও ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ফলে সেসব রোগ এখন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। নিউমোনিয়া, যক্ষা, পোলিও, গুটিবসন্ত—এমনকি কলেরা ও টাইফয়েডের মতো মহামারিও আজ বিলুপ্তপ্রায়। ম্যালেরিয়ার প্রকোপও অনেক কমেছে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগের চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। ক্যান্সার চিকিৎসায়ও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি, সুপেয় পানি, পুষ্টিকর খাদ্য আর আধুনিক জীবনব্যবস্থার  সমন্বয়ে গত শত বছরে মানুষের আয়ুষ্কাল বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।

তবুও শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা এখনও বিশ্বের মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবই কম। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে শতবর্ষীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লক্ষ ৭৩ হাজার। জাপানে শতবর্ষীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সেখানে শতবর্ষী মানুষের হার প্রায় ০.০৬ শতাংশ। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা খুবই সামান্য। অর্থাৎ, শতবর্ষ পর্যন্ত বাঁচতে পারা মানুষের সংখ্যা এখনো বিরল।

এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, গত একশ বছরে গড় আয়ু দ্বিগুণেরও বেশি হলেও মানুষ বার্ধক্যকে এখনও জয় করতে পারেনি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের শরীর ভঙ্গুর হয়, হাড় হয় দুর্বল, মাংসপেশী শিথিল হয়, ত্বক অমসৃণ হয়, দৃষ্টি ঝাপসা হয় এবং স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যায়। শরীর নানা রোগের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে এবং একসময় ধীরে ধীরে মৃত্যু ঘটে, আর এটাকেই আমরা মানুষের স্বাভাবিক বার্ধক্যজনিত মৃত্যু বলে মেনে নিয়েছি।

কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলছেন, বার্ধক্য আসলে একটি রোগ এবং এই রোগ নিরাময়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন জীবকোষের ভেতরে ঘটে যাওয়া কিছু কিছু জেনেটিক ও এপিজেনেটিক পরিবর্তন মানুষের বার্ধক্যের জন্য মূলত দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে: 

• ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ
• টেলোমিয়ারের ক্ষয়
• হিস্টোনের পরিবর্তন
• মাইটোকন্ড্রিয়ার ত্রুটি
• প্রোটিনের অবক্ষয়
• নিয়ন্ত্রণহীন মেটাবলিজম
• প্রদাহজনিত অণুর বৃদ্ধি
• ক্ষয়প্রাপ্ত স্টেম সেল

গবেষকরা প্রাণী ও উদ্ভিদের মডেলে দেখেছেন, এই পরিবর্তনগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তাদের আয়ুষ্কাল কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব।এজন্য বর্তমানে সারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণাগারে বিলিয়ন ডলারের "বার্ধক্য গবেষণা" (Aging Research) চলছে।

এই বিষয়ে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক ডেভিড সিনক্লেয়ার "লাইফস্প্যান" নামে একটি বই লিখেছেন। এই বইতে বার্ধক্যের জৈবিক কারণ ও প্রতিরোধের সম্ভাবনা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বইটি প্রকাশের পর থেকেই আলোচিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল আগ্রহ জাগিয়েছে। ডক্টর সিনক্লেয়ার দেখিয়েছেন, ডিএনএর ভাঙন ও এপিজিনোমের পরিবর্তনের কারণে কোষ ধীরে ধীরে তার স্বকীয়তা হারায় এবং বার্ধক্যের দিকে অগ্রসর হয়। তবে এই প্রক্রিয়াকে থামানো বা উল্টে দেওয়া গেলে বার্ধক্যকে বিলম্বিত করা সম্ভব। ইতিমধ্যেই ইঁদুরের উপর করা তাঁর পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফলাফল মিলেছে।

আজকের যুগের বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, আগামী শতাব্দীর মধ্যে মানুষের সুস্থ আয়ুষ্কাল ১৫০ বছর কিংবা তারও বেশি হতে পারে। আজ জন্ম নেওয়া শিশুটি হয়তো ১৫০ বা ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচবে, এমন সম্ভাবনা এখন একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। শুনতে কল্পনার মতো হলেও, মনে রাখতে হবে, কল্পনাকেই যুগে যুগে বিজ্ঞান বাস্তব করেছে। বিজ্ঞানের রথে চড়ে মানুষ আগামী শতাব্দীতে বার্ধক্যকে জয় করে আরও সুদীর্ঘ ও সুস্থ জীবন পাবে, এই আশা আমরা করতেই পারি।

© তানভীর হোসেন

Comments