মহাবিশ্বের সূচনা: নতুন চোখে, নতুন পথে


মহাবিশ্বের সূচনা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কিভাবে শুরু হলো এই অসীম মহাকাশ, তারার মেলা, আর আমাদের চেনা এই সুন্দর পৃথিবী? বিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোচিত উত্তরটি হলো ‘বিগ ব্যাং’, এক  মহাবিস্ফোরণ, যেখান থেকে সময়, স্থান আর শক্তির জন্ম। এই তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে আধুনিক কসমোলজির ভিত্তি। কিন্তু বিজ্ঞান আরো বলে, বিগ ব্যাংয়ের পরপরই নাকি ঘটেছিল আশ্চর্য এক ঘটনা। সেকেন্ডের কোটি কোটি ভাগের কম সময়ের মধ্যেই মহাবিশ্ব ফুলে-ফেঁপে বিশাল হয়ে উঠেছিল। এই হঠাৎ ব্যাপক প্রসারণের ঘটনাকে বলা হয়, ‘ইনফ্লেশন’। দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা মনে করছিলেন, ইনফ্লেশন ছাড়া মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কিন্তু এবার একদল বিজ্ঞানী তুলে ধরেছেন নতুন এক ধারণা, যেটা শুধু সাহসী নয়, রীতিমতো বিপ্লবী।

বার্সেলোনা ও পাডুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে তৈরি এই তত্ত্ব বলছে, মহাবিশ্বের জন্ম ব্যাখ্যা করতে আদৌ ইনফ্লেশনের কোন প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ, এই ‘বিস্ময়কর দ্রুত প্রসারণ’ আসলে কোনো আবশ্যিক ঘটনা ছিল না। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, শুধু মহাকর্ষ এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মৌলিক নিয়ম অনুসরণ করলেই আমরা মহাবিশ্বের সূচনা থেকে শুরু করে তার গঠন ও বিবর্তনের গল্প বলে দিতে পারি। তাঁদের দাবি, মহাবিশ্বের সমতলতা, এর অভিন্ন গঠন, এমনকি গ্যালাক্সির জন্ম—এসবই বোঝানো যায় এই নতুন মডেলে, কোনো “ইনফ্লাটন ফিল্ড” বা কাল্পনিক শক্তি অথবা ফ্রি প্যারামিটার ছাড়াই।

এই ধারণা যদি সত্যি হয়, তবে সেটি শুধু ইনফ্লেশন তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করবে না, বরং বিজ্ঞান পাঠ্যবইগুলোই নতুন করে লিখতে হতে পারে। কারণ এতদিন যে তত্ত্বকে আমরা ‘অবশ্য মানতে হবে’ বলে ধরে নিয়েছিলাম, সেটি যদি অপ্রয়োজনীয় প্রমাণিত হয়, তবে আমাদের পুরো মহাজাগতিক ব্যাখ্যার ভিতটাই পাল্টে যাবে। 

যদি মহাবিশ্বের জন্ম ব্যাখ্যা করতে কোনো ‘অতিরিক্ত অনুমান’ বা ‘কাল্পনিক শক্তি’র দরকার না হয়, তবে বিজ্ঞান আরও সরল হয়ে উঠবে। আর এটিই তো বিজ্ঞানের প্রকৃত সৌন্দর্য- সরল নিয়মে জটিল বাস্তবতার ব্যাখ্যা।

তবে এই তত্ত্ব এখনো মূলত  কাগজে-কলমে রয়েছে। পরীক্ষার মাধ্যমে এর সত্যতা যাচাই করতে হবে। যার জন্য দরকার আরও গভীর পর্যবেক্ষণ, উন্নত টেলিস্কোপ, এবং নির্ভুল ডেটা। কিন্তু এর মধ্যেই এই তত্ত্ব একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে, তাহলে এতদিন আমরা কি ভুল পথেই হেঁটেছিলাম? নাকি এই নতুন ধারণাই আমাদের নিয়ে যাবে আরও গভীর সত্যের খোঁজে?

একসময় যেভাবে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বদলে দিয়েছিল আমাদের বিশ্ব জগতের চিত্র, সেভাবেই  এই নতুন তত্ত্ব হয়তো একদিন বদলে দেবে মহাবিশ্বের সূচনালগ্ন সম্বন্ধে আমাদের ধারণা। বিজ্ঞান কখনোই চুপচাপ বসে থাকে না, বরং ক্রমাগত প্রশ্ন তোলে, পুরোনো ভাবনাগুলোকে কাঁপিয়ে দেয়, আর সত্যের পথে এগিয়ে চলে অজানা অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েই। আর এবার এই নতুন গবেষণা সেই পথে এক সাহসী পদক্ষেপ।

তথ্যসূত্র: Inflation without an inflaton,  D. Bertacca, R. Jiménez, S. Matarrese,  A. Ricciardone (2025)
Physical Review Research, vol. 7, issue 3.

Comments