মহাবিশ্বের গল্পটা শুরু হয়েছিল বিশাল এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে, যার নাম বিগ ব্যাং। সেই অসাধারণ মুহূর্তে স্থান, কাল আর শক্তি সব একসাথে সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের পরিচিত সবকিছু—পদার্থ, আলো, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, এই চেনা মহাবিশ্বের শুরুটা হয়েছিল সেখান থেকেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই শুরুর সময়ের কোনো প্রমাণ কি আদৌ পাওয়া সম্ভব? সময়ের এতটা গভীরে ফিরে গিয়ে কি দেখা সম্ভব প্রথম আলো, প্রথম সৃষ্টি?
বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন বহুদিন ধরেই। আর মনে হচ্ছে, সেই আদিম আকাশ থেকে সত্যিই এক চিঠি এসে পৌঁছেছে, এক প্রাচীন এক গ্যালাক্সির আলোয়। এই গ্যালাক্সির নাম রাখা হয়েছে AMORE6। দেখতে ছোটখাটো, কিন্তু তার গল্পটা বিশাল। এর আলো আমাদের চোখে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর। মানে, মহাবিশ্ব যখন একেবারে ৮০০ মিলিয়ন বছরের সদ্যজাত শিশু, তখন এই গ্যালাক্সির জন্ম হয়েছিল। আমাদের পৃথিবী তখন ছিল না, সূর্যও ছিল না। অথচ সেই অতল অতীত থেকে আলো এসে পৌঁছেছে আজকের পৃথিবীতে, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের চোখে। সেই আলো আমাদের জানিয়ে গেছে, মহাবিশ্বের প্রথম পাতাগুলোতে কী লেখা ছিল।
এই গ্যালাক্সির সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো, এতে কোনো ভারী মৌল নেই। অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন, লোহা—যে মৌলগুলো দিয়ে আমরা তৈরি, তা এখানে অনুপস্থিত। এই গ্যালাক্সিতে আছে শুধু হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, আর সামান্য কিছু লিথিয়াম। এমন আদিম গ্যালাক্সি এর আগে কখনো জ্যোতির্বিদদের চোখে পড়েনি। বিগ ব্যাংয়ের পর প্রথমে যেসব গ্যালাক্সির জন্ম হয়েছিল, তাদের মধ্যে একটিকে এতদিনে খুঁজে পাওয়া গেল।
এই গ্যালাক্সির আলো এতই ক্ষীণ যে, স্বাভাবিকভাবে আমরা সেটাকে কখনোই দেখতে পেতাম না। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে আরেকটি বিশাল গ্যালাক্সি তার ঠিক সামনে ছিল, আর সেটি একটি 'মহাকর্ষীয় লেন্স'-এর মতো কাজ করেছে। এই প্রক্রিয়ার ফলে পিছনের ক্ষীণ আলো অনেকটা বড়ো হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। এই আশ্চর্য যোগাযোগের কারণেই আমরা আজ জানতে পারছি সেই প্রাচীন গ্যালাক্সির খবর।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গ্যালাক্সি সম্ভবত "পপুলেশন থ্রি" তারাদের বাসস্থান। এরা ছিল প্রথম প্রজন্মের তারা, একদম খাঁটি হাইড্রোজেন-হিলিয়াম দিয়ে গঠিত। এতদিন এসব নক্ষত্র ছিল শুধু কাগজে-কলমে, আজ তারা যেন একটু একটু করে বাস্তব হয়ে উঠছে।
তবে AMORE6-এর এই আলোই প্রথম নয়, যা আমাদের মহাবিশ্বের অতীতের আলোর খোঁজ দিয়েছে। এরও অনেক আগে বিজ্ঞানীরা পেয়েছিলেন এক অবিশ্বাস্য সাক্ষ্য, যার নাম কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা CMB। বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৩৮০,০০০ বছর পর মহাবিশ্ব এতটা ঠান্ডা হয়ে যায় যে, আলোককণা প্রথমবারের মতো মুক্তভাবে ভ্রমণ করতে পারে। তখনকার সেই বিকিরণই হলো CMB।
১৯৬৫ সালে আরনো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন নামে দুজন অ্যামেরিকান রেডিও প্রকৌশলী এই বিকিরণ আবিষ্কার করেন। সেটাই ছিল বিগ ব্যাং-এর প্রথম প্রমাণ। আজও সেই কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। আর এই বিকিরণের তাপমাত্রা মাত্র ২.৭ কেলভিন, যেটা একেবারে হিমশীতল। CMB আমাদের দেখিয়েছে বিগ ব্যাংয়ের প্রথম পদচিহ্ন, আর AMORE6 যেন দিয়েছে মহাবিশ্বের প্রথম বেড়ে উঠার গল্প। একটা দেখিয়েছে প্রথম বিকিরণ, আর আরেকটা দেখাচ্ছে প্রথম তারাদের জনপদ। বিগ ব্যাং শুধু তত্ত্ব নয়, এটা এক বাস্তব ইতিহাস, যার ছাপ এখনও মহাকাশের গভীরে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।
AMORE6 গ্যালাক্সি দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন মহাবিশ্বের শুরুটা সত্যিই তেমনই ছিল যেটা বিগ ব্যাং তত্ত্বে বলা হয়েছে। শুরুতে হালকা মৌল ছিল, ভারী মৌল এসেছিল পরে। নক্ষত্রের ভেতরের পারমাণবিক চুল্লিতে ভারী মৌলের জন্ম হয়েছে। আজ আমরা যেসব মৌলিক পদার্থে তৈরি, যেমন কার্বন, লোহা, ক্যালসিয়াম এগুলো সবই প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্রদের মৃত্যুর ফল। কিন্তু এসব নক্ষত্রের জন্মের ঠিক আগমুহূর্ত, সেই একেবারে ‘নির্মল’ সময়টাকেই আজ আমরা AMORE6-এর মাধ্যমে চাক্ষুষ দেখতে পাচ্ছি। এটা শুধু একটা গ্যালাক্সি নয়। এটা যেন মহাবিশ্বের আদ্যিকালের একটি পোস্টকার্ড। যেটা লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে হঠাৎ করে এসে আমাদের হাতে পড়েছে।
তথ্যসূত্র: ফিজিক্স ডট অর্গ।
Comments